ষাটের দশকে নারী শিক্ষা ছিল অনেক কঠিন। স্কুলে পড়াশোনা করা অনেক পরিবারের জন্য ছিল কঠিন চ্যালেঞ্জ। সহশিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল খুবই কম, এবং পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াও ছিল ঝঞ্ঝাটপূর্ণ। অভাব অনটন, খাদ্য, পোশাক ও পরিচ্ছদের মাধ্যমে মৌলিক মানবিক চাহিদা পূরণে অনেক পরিবারই সক্ষম ছিল না। এমনই সময়ে নিজের শিক্ষার মধ্যে দিয়ে অন্যদেরও শিক্ষা প্রদানে এগিয়ে এসেছিলেন জাসিন্তা নকরেক। তাঁর বাড়ি টাঙ্গাইলের মধুপুর গড়ে, শালবন এলাকার টেলকি মান্দি গ্রামে। তিনি ১৯৬৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন, তার বাবার নাম স্বর্গীয় মার্টিন হাদিমা। ঐ সময় শালবন ছিল ঘন অরণ্যেঘেরা এক বনাঞ্চল, যেখানে বিভিন্ন গাছপালা, লতা-পাতা এবং জীবজন্তুর প্রাকৃতিক অভयন্তর ছিল। জাসিন্তার শৈশব, কৈশোর এবং যুবক জীবন এই গড় অঞ্চলে কেটেছে। সম্প্রতি, মধুপুর শহর থেকে প্রায় ১০-১২ কিলোমিটার দূরে অরণখোলা ইউনিয়নের টেলকি গ্রামে গিয়ে তার জীবন ও সংগ্রামের গল্প শুনে জানা যায়, তিনি ২০২৫ সালে উপজেলা এবং জেলা পর্যায়ে সমাজসেবায় অসামান্য অবদানের জন্য শ্রেষ্ঠ জয়িতা সম্মাননা प्राप्त করেছেন।
জাসিন্তা নকরেক তার গ্রাম থেকে বন পাড়ি দিয়ে পায়ে হেঁটে স্কুলে আসতেন। বন পাড়ি দেওয়া ছিল ভয়ংকর, কখনও সহযাত্রী পেতেন, কখনও পাননি। ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে, ১৯৬৯ সালে তিনি ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা শুরু করেন। তবে কোভিড ও অসুস্থতার কারণে তাঁর পড়াশোনা কিছু সময়ে বন্ধ হয়ে যায়। সেই সময়ে তার মা অসুস্থ থাকায় পরিবারের দেখভালের দায়িত্ব তার কাঁধে এসে পড়ে। কিন্তু এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও, ১৯৭৫ সালে আবার স্কুলে ভর্তি হয়ে অষ্টম শ্রেণি সম্পন্ন করেন। পরে নবাবগঞ্জের গোল্লা মিশন সেন্ট গালর্স হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাশ করে, এরপর টাঙ্গাইলের কর্পোরেশনের বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন।
তার কথা অনুযায়ী, নিজ এলাকায় পর্যাপ্ত স্কুল না থাকার কারণে ১৯৮৩ সালে প্রশিক্ষণ নিয়ে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। তিনি প্রথমে সাইনামারী ও পরে বেরিবাইদ মিশনারী স্কুলে কাজ করেন। এভাবে, গাইরা, টেলকি, গেতচুয়া ও গাইরা মিশনারী স্কুলে দীর্ঘ ৪৩ বছর ধরে শিক্ষাদান করে আসছেন। তার মাধ্যমে তার নিজ জাতিগোষ্ঠীর পাশাপাশি আশপাশের এলাকাও আলোয় আলোকিত হয়েছে। শুধুমাত্র শিক্ষকতা নয়, তিনি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন।
তিন মেয়ের মা, স্বামীসহ শান্তিপূর্ণ জীবনজাপন করে যাচ্ছেন। তাঁর বড় মেয়ে ঢাকায় ব্যবসা করে, মেঝো মেয়ে বসবাস করছেন বাংলাদেশ পুলিশের প্রশাসনিক বিভাগের সঙ্গে, আর ছোট মেয়ে জাপানে পড়াশোনা শেষ করে সেখানে চাকরি করছে।
অতিরিক্ত, তিনি গারো সম্প্রদায়ের নারীদের সংগঠনের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন, বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে চলেছেন। তার পরিবারের নানা আখ্যান অনুসারে, তিনি মধুপুরের জুমচাষের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেন, যেখানে ধান, দেওধান, কাউন ও অন্যান্য ফসলের চাষ হতো। এখন সেই জুমের স্মৃতি তাঁর মনে চিরকাল রয়ে গেছে।
জাসিন্তা বলেন, মানুষ হিসেবে ভালো হওয়া জরুরি, সততা ও সাহায্যপ্রাথী মনোভাবের গুরুত্ব বোঝা উচিত। সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তি যেন আদর্শical পরিবারের মতো গড়ে উঠতে পারে। ধর্মীয় মূল্যবোধ ও আধ্যাত্মিকতার মাধ্যমে সুন্দর সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। তিনি বিশ্বাস করেন, অসৎ ও ক্ষতিকর মনোভাব থেকে বিরত থেকে সবাই যেন পরস্পরের পাশে দাঁড়ায় এবং শিক্ষিত হয়ে উঠতে। যেন আমাদের আগামী প্রজন্ম একটি ভালো ও সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারে।
তার স্বামী শৈলেস দালবত বলেন, তারা স্বামী-স্ত্রী সংসার করছেন। তিনি কৃষি কাজ করেন, তার স্ত্রী শিক্ষকতা করে। তাঁদের মেয়েদেরও উচ্চশিক্ষা হয়েছে, তারা বিভিন্ন পেশায় জড়িত। তিনি গর্বের সঙ্গে জানান, মানুষকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসাটা তাদের মূল লক্ষ্য। সকলের জন্য সুখী ও সুন্দর সমাজ গড়ার জন্য জাসিন্তার এই অমোঘ সংগ্রাম তিনি প্রশংসা করেন।






