মিয়ানমারে দীর্ঘ দিন ধরে চলমান গৃহযুদ্ধের প্রভাব স্পষ্টভাবে পড়েছে বাংলাদেশের সীমান্তে। বিশেষ করে টেকনাফের সেকেন্ডবন্দরটি গত নয় মাস ধরে কার্যত বন্ধ হয়ে পড়েছে, যেখানে স্বাভাবিক বাণিজ্য অনেকটাই অবরুদ্ধ। এর মূল কারণ হলো, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের নাফ নদীতীরে নাৎসী সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (এএ) ব্যাপক দাপট দেখাচ্ছে, যার কারণে পণ্যবাহী নৌযান চলাচল প্রায় বন্ধই হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতির কারণে দেশীয় রাজস্ব খাতে বড় ধরনের ক্ষতি হলেও, সরকার নতুন করে ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। সীমান্তের বিভিন্ন সূত্র বলছে, রাখাইন রাজ্যের প্রায় ২৭০ কিলোমিটার এলাকা এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে এবং নাফ নদে পণ্য চলাচল বন্ধ থাকায় জান্তা সরকারের সঙ্গে এই সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘর্ষ বৈধভাবে বাণিজ্য চালিয়ে যেতে অসুবিধা সৃষ্টি করেছে। সর্বশেষ, গত বছরের ১২ এপ্রিল মংডু থেকে একটি পণ্যবাহী বোট বন্দরে এসে পৌঁছেছিল, এরপর আর কোনো বড় চালান টেকনাফে আসেনি।
বর্তমানে স্থলবন্দরটির চিত্র উদ্বেগজনক, এক সময়ের ব্যস্ত এই এলাকা এখন প্রায় জনমানবহীন হিসেবে দেখা যাচ্ছে। শত শত ট্রাক ও শ্রমিকের পরিবর্তে এখন সেখানে তালাবন্ধ গুদাম এবং ফাঁকা ঘাট। বন্দরের নিরাপত্তা কর্মীরাও বেশ উদাসীন, কারও কাছে কর্মক্ষমতা তেমন নেই। ইউনাইটেড ল্যান্ড পোর্ট লিমিটেডের তথ্যে জানা গেছে, মাসে তারা প্রায় ৩০ লাখ টাকা লোকসান গুণতে হয়েছে, এবং গত ৯ মাসে এই ক্ষতির পরিমাণ তিন কোটি টাকাকে ছাড়িয়ে গেছে। এছাড়া, আমদানিই-রপ্তানি বন্ধ থাকায় বিপুল সংখ্যক পচনশীল পণ্য গুদামে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যার ফলে ব্যবসায়ীরা প্রায় ১৫ কোটি টাকা সম্ভাব্য আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। বহু সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও বড় ব্যবসায়ী তাঁদের ব্যবসা সরে গিয়ে এখন চট্টগ্রাম বন্দরের দিকে ঝুঁকছেন।
এসব সংকটের ফলে স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুতর বিপর্যয় নেমে এসেছে, কমপক্ষে এখন পর্যন্ত দশ হাজার মানুষ সরাসরি কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২ হাজার নিবন্ধিত শ্রমিক ছাড়াও ট্রাক চালক, হেল্পার ও ছোট ব্যবসায়ীরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। শ্রমিক নেতাদের মতে, এই বন্দর ছিল টেকনাফ অঞ্চলের মানুষের জীবিকা নির্বাহের মূল উৎস, যা এখন বন্ধ থাকায় পরিবারগুলো চরম কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতিসহ স্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর দাবি, দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে বাণিজ্য পুনরায় শুরু করতে হবে। তাঁরা মনে করেন, মিয়ানমারের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার জন্য, বন্ধ পণ্য ফিরিয়ে আনতে এবং সীমান্তের বাণিজ্য সচল করতে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে সংশ্লিষ্ট পদক্ষেপ প্রয়োজন। বর্তমানে কাস্টমস ও ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যৎ অন্ধকার দেখছেন, কারণ এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সময়ের দাবি।






