ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ১১ দলীয় বৃহত্তর জোটের আসন ভাগাভাগি নিয়ে জটিলতা এখনও কাটেনি। বিশেষ করে প্রধান দুই শরিক দল, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর মধ্যে আসন বণ্টন নিয়ে তৈরি হওয়া দূরত্বের সমস্যা সমাধানে শীর্ষ নেতাদের হস্তক্ষেপের জন্য প্রয়োজনীয় আলোচনার আহ্বান জানানো হচ্ছে। জোটের দখল কতটা বিস্তৃত হয়েছে, তা উপস্থাপন করে বলা যায় যে, এখন ১১ দলে উন্নীত হওয়ায় এবং নতুন দল এনসিপি ও এবি পার্টি যোগ দেওয়ায় পুরনো হিসাব-নিকাশের ধারা বদলে গেছে।
প্রাথমিকভাবে, ইসলামী আন্দোলন শতাধিক আসনের দাবি তুললেও জামায়াত তাদের জন্য ৩৫-৪০টি আসন বরাদ্দের মত প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে, জামায়াত প্রায় ৩০টি আসন এনসিপিকে দেওয়ার ব্যাপারে প্রাথমিক সম্মতি দিলেও, এর ফলে ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। তারা মনে করে, জামায়াত নতুন শরিক হিসেবে এনসিপিকে তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম জানান, তাদের দল ১৪৩টি আসনে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে আছে। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ইসলামিক আন্দোলন কেন জামায়াতের কাছে আসন চাচ্ছে? তিনি তারকারা বলছেন, বরং তারা অন্য শরিকদের কাছে আসন ছেড়ে দেওয়ার অবস্থানে রয়েছেন। আবার, সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম মন্তব্য করেছেন, আসন ভাগাভাগির বিষয়ে সমঝোতা পরিস্থিতি ও পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে। তবে, বলছেন, যদি দেশ ও ইসলামের স্বার্থে তার কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন তারা বিষয়টি পুনর্বিচার করবে।
জামায়াতের মতে, ইসলামী আন্দোলনের দাবি করা ৭০-৭৫টি আসন সত্যিকার পরিকল্পনা নয়। তারা বলছেন, এর পেছনে কোনো তৃতীয় পক্ষের ষড়যন্ত্র বা উস্কানি থাকতে পারে, যা অবশ্যই খতিয়ে দেখা উচিত।
জোটের আলোচনার মাঝেই, জামায়াতে ইসলামী ২৭৬, ইসলামি আন্দোলন ২৬৮, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ৯৪, এনসিপি ৪৪, এবি পার্টি ৫৩ এবং এলডিপি ২৪টি আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে এবং মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সভাপতি মাওলানা মামুনুল হক বলেছেন, আসন বণ্টনে এখনো সম্পূর্ণ সমাধান হয়নি, বিশেষ করে বিতর্কিত আসনগুলোতে এখনও কোনো যৌথ জরিপ চালানো সম্ভব হয়নি। তবে তিনি আশাবাদী যে, আগামী ৩-৪ দিনের মধ্যে আলোচনা করে একটি নমনীয় সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হবে।
তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২০ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ তারিখ। এর আগে, দলগুলোকে ৩০০ আসনের চূড়ান্ত তালিকা নির্ধারণ করতে হবে। জামায়াতের সহকারী মহাসচিব হামিদুর রহমান আযাদ জানান, তারা সময়ের আগেই সমঝোতা চূড়ান্ত করতে চেষ্টা করছেন।
আসন ভাগাভাগির এই দীর্ঘ উত্তাপনাগরম পরিস্থিতিতে, জোটের পরিধি ৮ থেকে ১১ দলে উন্নীত হওয়ায় এখন আসন ভাগাভাগি গাণিতিক জটিলতায় রূপ নিয়েছে। জামায়াতের বিশেষ গুরুত্ব এবং ইসলামী আন্দোলনের ‘বড় শরিক’ হিসেবে তাদের অজুহাতের মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী প্রচারণায় সাফল্য না থাকায় তারা নিজেরা শক্তিশালী হওয়ার জন্য অন্যান্য ইসলামি দলগুলোর সাথে জোট গড়েছে। যাতে, নির্বাচনে বা ভোটের মাঠে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী বা শত্রুর সংখ্যা বাড়তে না পারে।
আগামী ২০২৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এই দিনই একই সঙ্গে স্থানীয় লোকসভা নির্বাচনও হবে। দেশের ৩০০ আসনে মোট ৩,৪০৬টি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হলেও, দলীয় ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে মোট দৈর্ঘ্য ২,৫৬৮টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে।
নিজেদের দাবি অনুযায়ী কমপক্ষে ১৫০ আসন না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। তাদের নেতাকর্মীরা মনে করছেন, জোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তারা ৩৫টি আসনে নির্বাচন করবে। ফলে, ৩০০ আসনের মধ্যে শত্রুতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাদ দিলে, দলের পক্ষ থেকে মোট ২৭২টি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে, এই অসন্তোষ শুধু ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে নয়, বরং আরেকটি বড় দল, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসও এই সমস্যা দেখাচ্ছে। তারা ৫০ আসন চাইলেও, পরে সমঝোতায় ১৩টি আসনে বসেছে। তাদের মুখপাত্র জালালুদ্দীন আহমেদ এখনো চূড়ান্ত আসনসংখ্যা প্রকাশ করেননি, বলে বলছেন, সবশেষ সিদ্ধান্তের পর জানানো হবে। তবে, দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।
অন্যদিকে, নতুন অংশগ্রহণে উজ্জীবিত এনসিপি, অর্ধশতাধিক আসন দাবি করলেও, এখন প্রাপ্ত সমঝোতার ভিত্তিতে তারা ২৬টি আসনে মনোনয়ন পেয়েছে। তাছাড়া, আসন বণ্টনে জামায়াতের অনেক প্রার্থীর মধ্যেও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াতে ইসলামীর নিজস্ব দুর্বলতা বিবেচনায় অন্যান্য ইসলামি দলগুলোর সাথে জোট করেছে। তবে, এই জোটের মূল লক্ষ্য হলো, প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিকে মোকাবেলা করা।
বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ মন্তব্য করেন, জামায়াতে নিজেদের আস্থা কম তার কারণই তারা বড় জোট করেছে, যাতে তারা ভোটের মাঠে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে। যারা এই জোটে যুক্ত, তারা প্রত্যেকেই পরস্পরকে ব্যবহার করছে নিজের সুবিধার জন্য। এ কারণেই, এ ধরনের জোট দীর্ঘস্থায়ী হয় না এবং তাদের মধ্যে আদর্শের জায়গা নেই।






