মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অপ্রত্যাশিত ঘোষণা বিশ্বজুড়ে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটি বড় চাপ ডেকে আনতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, জাতিসংঘের অন্তর্ভুক্ত ৩১টি সংস্থাসহ মোট ৬৬টি আন্তর্জাতিক সংগঠনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক চূড়ান্তভাবে ছেড়ে দিতে। এই তালিকায় রয়েছে এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, যারা বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, মানবাধিকার রক্ষা, গণতন্ত্রের উন্নয়ন এবং নারী ক্ষমতায়নে কাজ করে আসছে। বুধবার এক প্রেসিডেন্সিয়াল স্মারকের মাধ্যমে এই তালিকা প্রকাশ পেয়েছে, যেখানে জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন (ইউএনএফসিসিসি) এবং ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি) এর মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলোর নাম রয়েছে। এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন ইউনেস্কো, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা এবং প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকেও বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল, যা আন্তর্জাতিক কার্যক্রমে এক ধরনের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এসব সংস্থার বড় আর্থিক হাবে থাকায় তাদের প্রস্থানে আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রমের উপর ব্যাপক প্রভাব পড়বে। এর ফলস্বরূপ বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও অর্থায়ন আসত, তা মারাত্মকভাবে কমে যাবে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের মতো জরুরি ইস্যুতে কাজ করানোর জন্য নির্ভরযোগ্য সংস্থা আইপিসিসি-র মতো সংস্থার ওপর এ সিদ্ধান্তের প্রভাব বড় হবে, যা বৈশ্বিক জলবায়ু লড়াইয়ে বড় ক্ষতি ডেকে আনবে। হোয়াইট হাউজ তাদের এই পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি দেখিয়েছে, বলেছে সংস্থাগুলো আমেরিকার স্বার্থ রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং তাদের কাজে প্রভাব ফেলছে নেতিবাচক এজেন্ডা। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের বিপরীতে, বাংলাদেশের মত দেশগুলোর জন্য উন্নয়ন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বড় অপ্রাপ্তি তৈরি হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশ প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা পেয়েছিল। এই অর্থ মূলত খাদ্য নিরাপত্তা, শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলার জন্য ব্যয় করা হতো। এর মধ্যে ইউএসএআইডি (USAID) এর কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার পর, রোহিঙ্গা সহায়তা ছাড়া অন্য সব ক্ষেত্রে মার্কিন আর্থিক সহায়তা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ৬৬টি সংস্থা থেকে ওয়াশিংটনের বিচ্ছেদ বাংলাদেশের চলমান ও ভবিষ্যত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সাহাব এনাম খান বলছেন, আন্তর্জাতিক আইনের দুর্বলতা ও বিভিন্ন সংস্থার পতন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক দরকষাকষির ক্ষমতা কমিয়ে দেবে।
অন্যদিকে, বিশ্লেষক জাহিদ হোসেন বলেন, এই সিদ্ধান্তের প্রতীকী মূল্যও অনেক বড়। যখন যুক্তরাষ্ট্র অর্থায়ন বন্ধ করে দেয়, তখন অন্য ধনী দেশগুলোও একই পথে হাঁটতে পারে, যার ফলে বিশ্বব্যাপী সহযোগিতার ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়বে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবসর এই উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নতুন সংকটের সূচনা করতে পারে। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা এখন বিকল্প আয়ের উৎস খুঁজছেন এবং এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় কঠিন কূটনৈতিক কৌশল গ্রহণের পরিকল্পনা করছেন। মূলত, এই প্রস্থান বিশ্বের অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, যেখানে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে নিজেদের অগ্রগতির পথ আরও কঠিনভাবে পেরোতে হতে পারে।





