প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস দেশের যুবসমাজের প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থার আয়োজনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি আরও বলেন, দেশের উন্নয়নের জন্য উচ্চশিক্ষায় আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়াতে সার্ক সংগঠনের পুনরুজ্জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দরকার রয়েছে। মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে তিন দিনব্যাপী ‘দক্ষিণ এশিয়ার উচ্চশিক্ষার বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ নির্দেশনা’ শীর্ষক আঞ্চলিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা ব্যক্ত করেন তিনি।
অধ্যাপক ইউনূস উল্লেখ করেন, ঢাকায় উচ্চশিক্ষায় শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাবিদদের একত্রিত হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর গত কিছু মাসে ঢাকায় যা ঘটেছে, তা বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য আরও বেশী স্পষ্ট হবে। তিনি বলেন, এই সমাবেশ এর মাধ্যমে এই ঘটনাগুলোর পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন সম্ভব হবে।
সম্মেলনটি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অধীনে বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়িত হায়ার এডুকেশন অ্যাকসেলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট) প্রকল্পের অংশ। এতে যুক্তরাজ্য, মালদ্বীপ, মালয়েশিয়া, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশের ৩০ জন আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি এবং বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করছেন।
2024 সালের গণঅভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, তরুণরা তাঁদের চিন্তা ও মনন দিয়ে ফ্যাসিবাদী শাসনের মোকাবেলা করেছে। তারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে প্রতিবাদে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, যা বোঝা জরুরি। তিনি শহীদ স্কুলছাত্র শাহরিয়ার খান আনাসের ম mother’s কাছে লেখা চিঠির কথা উল্লেখ করেন, যেখানে সে রাজপথে অংশ নেওয়ার দায়িত্ববোধ দেখিয়েছিল।
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, এরকম ঘটনা হঠাৎ ঘটে না; শ্রীলঙ্কা ও নেপালেও এরূপ প্রতিরোধের ঘটনা দেখা গেছে, তবে ঢাকায় এর ব্যাপকতা বেশি। তিনি বিশ্বব্যাংককে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য এসব উদ্যোগ কতটা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু দুর্ভাগ্যবशত আজ সার্ক কার্যত অপ্রচলিত থাকায় এর গুরুত্ব কমে গেছে। তিনি বলেন, মূল ধারণা ছিল পারস্পরিক বিনিময় ও শেখার সুযোগ সৃষ্টি, যা এখন পুনরুজ্জীবনের জন্য তিনি বারবার আহ্বান জানিয়েছেন।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এই গণঅভ্যুত্থান দেশের পুরোনো কাঠামো পরিবর্তনের পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তরুণেরা নিজেদের নতুন সনদ তৈরি করছে এবং মনে করছে, দেশের মূল সমস্যা সংবিধানে নিহিত। এই পরিস্থিতিতে ভবিষ্যৎ সংবিধান নির্ধারণের জন্য গণভ_vote এর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থার মধ্যে উল্লেখ করেন যে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বর্তমানে কী ধরনের শিক্ষার পাঠ পড়ানো হয়—সেগুলো নতুন প্রজন্মের জন্য জরুরি। তিনি বলেন, তরুণরা ইতিমধ্যে নিজেদের রাজনৈতিক দল গঠন করতে শুরু করেছে, যারা পরে সংসদ নির্বাচনে যেতে বা শিক্ষামন্ত্রণালয়েও যোগ দিতে পারে।
অধ্যাপক ইউনূস শিক্ষাব্যবস্থার মূল সমস্যা হিসেবে বর্তমান চাকরির ভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থাকেও চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, মানবিক ও সৃজনশীলতা মূল মানবসম্পদ। অথচ এখনকার শিক্ষা পদ্ধতি এই সৃজনশীলতা বিনষ্ট করে, মানুষকে শুধুমাত্র চাকরির প্রস্তুতিতে মনোযোগী করে তোলে। তিনি বলেন, শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত তরুণদের উদ্যোক্তা ও পরিবর্তন কারিগর হিসেবে গড়ে তোলা, চাকরিপ্রার্থী নয়। কারণ কল্পনা ও সৃজনশীলতা মানুষকে নতুন বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখাতে পারে।
প্রসঙ্গে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সি আর আবরার। ইউজিসি’র ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন। উপস্থিত ছিলেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীন, বিশ্বব্যাংকের ডিস্ট্রিক্ট ডিরেক্টর জ্যঁ পেসমে, এবং ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তানজিমউদ্দিন খান।






