মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মার্কিন নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র অফিসিয়ালভাবে মিসর, জর্ডান এবং লেবাননের মুসলিম ব্রাদারহুড ও তার সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছে। এই সিদ্ধান্তের পিছনে রয়েছে ইসরায়েলের প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে বৈশ্বিক চাপ জোরদার করার লক্ষ্য। গত নভেম্বরের মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষরিত এক নির্বাহী আদেশের পর মার্কিন প্রশাসন এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিল ১৩ জানুয়ারি, ২০২৬। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতে, এই সংগঠনগুলো মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছে, যা শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর হুমকি।
মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী মার্কো রুবিও এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, মুসলিম ব্রাদারহুডের বিভিন্ন শাখা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত এবং এই কর্মকাণ্ডগুলো বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তি ব্যবহৃত হবে। তিনি এই সিদ্ধান্তকে মূল্যবান দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টার সূচনা হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, এই ঘোষণার মাধ্যমে অস্থিতিশীলতা ও সহিংসতা মোকাবিলা করা হবে। অভিযোগ রয়েছে যে, মুসলিম ব্রাদারহুডের বিভিন্ন শাখা নিজেদেরকে বৈধ নাগরিক সংগঠনের বলে পরিচয় দিলেও নোংরা পথ অবলম্বন করে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসকে সমর্থন দিয়ে আসছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলবিরোধী কার্যক্রমে লিপ্ত রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় বা ট্রেজারি বিভাগ এই সংগঠনগুলোকে ‘বিশেষভাবে মনোনীত বৈশ্বিক সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। জর্ডান ও মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডকে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে, লেবাননের শাখা সংগঠনের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। লেবাননের এই সংগঠনটিকে ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ বা এফটিও হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এই ঘোষণার ফলে সংগঠনগুলোর যেকোনো ধরনের অর্থায়ন বা সহায়তা দেওয়া এখন অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং তাদের আয়ের উৎস বন্ধ করতে কড়া অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি, এফটিও তালিকায় অন্তর্ভুক্তির কারণে লেবাননের সদস্যরা এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারবেন না।
মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডের সভাপতি সালাহ আবদেল হক এই মার্কিন সিদ্ধান্তকে প্রতিহত করে বলেন, এটি ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের চাপের কারণে এবং বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ ছাড়া নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, তারা আইনি লড়াই চালিয়ে যাবেন। হাসান আল-বান্নার নেতৃত্বে ১৯২৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনটি শান্তিপূর্ণ রাজনীতি চর্চার জন্য কাজ করে আসছে। ২০১২ সালে মিসরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তারা জয়ী হলেও ২০১৩ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে নিষিদ্ধ হয়।
এই মার্কিন সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধুমাত্র অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক নয়, জর্ডান ও লেবাননের রাজনীতিতেও বড় পরিবর্তনের আভাস দেখা যাচ্ছে। লেবাননের পার্লামেন্টে ইলেম আল-জামা আল-ইসলামিয়া গোষ্ঠী প্রতিনিধিত্ব করে এবং গাজা পরিস্থিতিতে হিজবুল্লাহকে সমর্থন দিয়ে এসেছে। জর্ডানে তাদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক শাখা ‘ইসলামিক অ্যাকশন ফ্রন্ট’ ২০২৪ সালের নির্বাচনে ৩১টি আসন লাভ করে। মিসরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, এটি একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত।
অন্তর্বর্তীভাবে, এই নিষেধাজ্ঞার প্রভাব মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও মুসলিম সম্প্রদায়ের উপরও পড়েছে। ফ্লোরিডা ও টেক্সাসের রিপাবলিকান গভর্নররা স্থানীয় মুসলিম নাগরিক অধিকার সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তারা তাদের সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে অভিহিত করে থাকলেও, এই সংগঠনগুলো তাদের নিজস্ব বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। সত্ত্বেও, এই পদক্ষেপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে নতুন একটি বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।






