সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবারে পুষ্পমেলার প্রবল উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। উজ্জ্বল রোদে শীতের আমেজ অনুভব করে সাধারণ দর্শনার্থীরা খুবই সুখী হয়েছেন। শীতের দাপট অনেকটাই কমে যাওয়ায় মেলার পরিবেশ এখন বেশ স্নিগ্ধ। সকাল থেকেই সূর্যালোকে আলোকিত হয়ে ওঠে মেলা প্রাঙ্গণ। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পায়। বিক্রেতারা জানান, আগের তুলনায় তাদের বিক্রয় ব্যাপকভাবে বেড়েছে।
শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) মেলা প্রাঙ্গণে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, জুমার নামাজের পরে মানুষের দীর্ঘ লাইনে টিকিটের জন্য লাইন জমে যায়। মেলার ভেতরে উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে। দোকানিরা আনন্দিত, কারণ বিক্রয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়ে গেছে। ক্রেতারা তাদের প্রিয় পণ্য সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন স্টল ঘোরাফেরা করছে। কিছু ক্রেতা কেনাকাটা শেষে স্টলের পাশে বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন। কাপড়, প্রসাধনী এবং ক্রোকারিজসহ বিভিন্ন পণ্যের স্টলে ভিড় বেশি। রাজা মামার চায়ের স্টলেও মানুষের আনাগোনা লক্ষ্য করা গেছে।
দুপুরের দিকে মেলা প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা গেছে, পরিবার-পরিজন এবং বন্ধু-বান্ধব নিয়ে সকাল থেকে আসা মানুষের সংখ্যা অনেকটাই বেড়ে গেছে। বিকালে এটি পুরো জনসমুদ্রে রূপ নেয়। প্রবেশের জন্য পর্যাপ্ত টিকিট বুথ থাকায় এখানে আসা ক্রেতাদের খুব একটা অসুবিধা হয়নি।
বাইরে থেকে আসা ফাহাদ দম্পতি বলছেন, তারা বিভিন্ন ফার্নিচার শোরুম ঘুরে বেশ কিছু পছন্দের জিনিস পেয়েছেন, যেগুলো দাম কিছুটা মাছাবেই কিনতে পেরেছেন। অন্যদিকে সুজানা ইসলাম বলেন, দুপুর থেকে তিনি বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখে পছন্দের কিছু পণ্য নির্বাচন করেছেন, যা ফেরার সময় নিয়ে যাবেন। মেলার চারদিক খোলা থাকায় ঠাণ্ডা বাতাসের শীতে তারা বেশ উপভোগ করেছেন।
মেকারস কোম্পানির সেলস অ্যাম্বাসেডর গাজী আশরাফ হোসেন জানান, এখন পর্যন্ত বিক্রির পরিমাণ সন্তোষজনক। অন্যান্য দিনের তুলনায় আজ বিক্রয় ভালো। ক্রেতারা মূলত কেনার জন্যই আসছেন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আঁখি মনি বলেন, তারা স্বামী ও সন্তানসহ মেলায় এসে ভিন্ন ভিন্ন পণ্য কেনাকাটা করেছেন, বিশেষ করে গৃহস্থালি ও রান্নাবান্নার জন্য। হৃদয় খান নামে এক সেলস কর্মকর্তাও জানান, শুক্রবার বেচাকেনার সংখ্যা খুবই ভালো, যদিও সপ্তাহের শুরুতে শীতের কারণে ক্রেতারা কম এসেছেন। এই দিনগুলোতে বেচাকেনার পরিমাণ আরও বাড়বে বলে আশা করছেন তিনি।
রাজা মামার চায়ের স্বত্বাধিকারী রাজা মামা বলেন, শুক্রবার ব্যাপকভাবে মানুষ আসছে এবং ব্যবসাও ভাল যাচ্ছে। নাসির হোসেন, টার্কিস প্যাভিলিয়নের মালিক, জানান, শেষ কয়েক দিন বিক্রয় খুবই কম ছিল। তবে আজ দুপুরের পর থেকে পরিস্থিতি ভালো হতে শুরু করেছে।
আড়াই হাজারের বেশি বন্ধু মিলে মেলায় এসেছেন আশরাফ ভূঁইয়া, তারা চারটি ব্লেজার কিনেছেন, এবং ছাড় পেলেই আরও কিছু কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।
দর্শনার্থী শাহাবুদ্দিন বলছেন, এখানকার কেনাকাটায় শত শত জনপ্রিয় জিনিস দেখার সুযোগ হয়, এবং অফার ও ছাড়ের কারণে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য কেনা যায়। তিনি একটি এলইডি টিভি ১৫ শতাংশ ছাড়ে কিনেছেন।
সাকুরা হান্ডি ক্যাপসের ম্যানেজার রাকিব হোসেন বলেন, প্রথম এক সপ্তাহে বিক্রি খুব বেশি হয়নি, তবে শুক্রবার ও শনিবার বিক্রি বেড়ে গেছে। প্রতিদিন দুপুরের পরই ক্রেতা-বিক্রেতা এবং উদ্যোক্তা মিলনমেলা জমে উঠছে। সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
মেলার ইজারাদার ডি.জি. ইনফোটেক লিমিটেডের ম্যানেজার আমিনুল ইসলাম হৃদয় জানান, প্রথম দিকে তাপমাত্রা কম থাকায় জনসমাগম তুলনামূলকভাবে কম ছিল। এখন তাপমাত্রা কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। শুক্র ও শনিবারের মতো দিনগুলোতে ক্রেতা-দর্শনার্থীর উপস্থিতি সন্তোষজনক ছিল। তিনি আরও আশা প্রকাশ করেন যে, আসন্ন ছুটির দিনগুলোতে মেলা আরও জমবে।
নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ সবজেল হোসেন বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ৩ দিনের শোক ঘোষণা থাকায় মেলার শুরু কিছুটা মন্থর ছিল। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক, দর্শনার্থীর সংখ্যাও বেড়েছে। মেলায় ৭ শ’ পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সক্রিয় আছেন। কারাপণ্যের বিক্রেতা হুমায়ুন কবির জানান, নানা কারণে এবারের বেচাকেনা কিছুটা কম হলেও কারা পণ্য প্রতিদিনের চাহিদা এখনও রয়ে গেছে।
অন্যদিকে, আয়োজকরা মনে করছেন, বাংলাদেশের বৈশ্বিক বাণিজ্যকে এগিয়ে নিতে এই বাণিজ্যমেলা গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম। উদ্যোক্তারা নিজেদের পণ্য প্রদর্শন করে আন্তর্জাতিক বাজারে স্থায়ী স্থান করে নেয়ার চেষ্টা করছেন। এবার মেলায় পলিথিন ও একমাত্র ইউজ প্লাস্টিকের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পরিবেশ রক্ষা করার জন্য বিকল্প হিসেবে বস্ত্র ও পাটের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব শপিং ব্যাগ কম দামে সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে, রূপগঞ্জের কিছু উদ্যোক্তার অংশগ্রহণ না থাকায় কিছু ক্ষোভ দেখা গেছে।
এই মেলা ৩ জানুয়ারি শুরু হয়ে চলবে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত। এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৩ লাখ ৭৩ হাজার বর্গফুটের আয়তনে। মেলা প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকলেও, শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চালু থাকবে।






