বঙ্গোপসাগরের মোহনীয় জলরাশি থেকে উঠে আসা আলোচিত দ্বীপ ভাসানচরের প্রশাসনিক সীমানা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলমান বিরোধের অবসান ঘটাতে চলেছে। এই বিরোধের সমাধানে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দ্বীপটিকে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে ভূমি মন্ত্রণালয়। আন্তঃজেলা সীমানা বিরোধের সমাধানে গঠিত কারিগরি টিমের বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ১৩ জানুয়ারি মন্ত্রণালয় থেকে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়েছে। সন্দ্বীপ উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মং চিনু মারমা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মুক্তিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, কারিগরি টিমের পর্যালোচনায় ভাসানচরসহ মোট ছয়টি মৌজা সন্দ্বীপ উপজেলার ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে পড়ে। এই প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ছয় মৌজাকেই সন্দ্বীপের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর আগে চট্টগ্রাম জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিরোধপূর্ণ ছয়টি মৌজা — ভাসানচর, শালিকচর, চর বাতায়ন, চর মোহনা, চর কাজলা ও কাউয়ারচর— সিএস (ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে) ও আরএস ম্যাপের পেন্টাগ্রাফ ও আর্কাইভের বিশ্লেষণে নিশ্চিত হয় যে এগুলো মূলত সন্দ্বীপ উপজেলার অঙ্গ। যদিও দিয়া জরিপের সময় ভুলবশত এগুলো হাতিয়া উপজেলার অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছিল, কিন্তু বাস্তব পর্যালোচনায় দেখা গেছে এগুলোর অবস্থান সন্দ্বীপের সীমানায়।
ভাসানচরের মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিনের এই বিরোধের ভিত্তিতে রয়েছে রাজনৈতিক ইতিহাসের জটিলতা। ২০১০ সালে জেগে ওঠা এই দ্বীপটি প্রথম আলোচনায় আসে ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের কেন্দ্র হিসেবে। অভিযোগ উঠেছে, সে সময় তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে দ্বীপটিকে নিজের জেলা নোয়াখালীর থাকিয়া উপজেলাধীন করেছিলেন। এই ব্যাপারে সন্দ্বীপের বাসিন্দাদের দাবি ও ক্ষোভ থাকলেও তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তারা শক্তিশালী আন্দোলনে রূপ দিতে পারেননি। তবে ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের ফলে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে সন্দ্বীপের সাধারণ জনগণ দ্বীপটিকে আবার নিজেদের মানচিত্রে ফিরে পেতে সক্রিয় হন।
জনগণের এই দাবির প্রেক্ষাপটে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে। এই কমিটিতে সন্দ্বীপ ও হাতিয়া উপজেলার প্রশাসনিক কর্মকর্তাসহ পেশাজীবীরা ছিলেন। একাধিক সভার পর চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রাজস্ব শাখা চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়, যা ভিত্তি করে ভূমি মন্ত্রণালয় অবশেষে ভাসানচরকে সন্দ্বীপের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেয়। এতে দ্বীপের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিরোধের সমাধান নিশ্চিত হবে, যা এলাকার জনমনে আস্থা ও স্বস্তি ফেরাবে।






