চলতি বছরের অস্কার উৎসবে ‘সিনার্স’ সিনেমা ব্যাপক আলোচনায় এসেছে বিশ্বের চলচ্চিত্র মহলে। এই সিনেমা ২৪ বিভাগে মনোনয়ন পাওয়ার মধ্যে ১৬টি মনোনয়ন জয় করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে, যা আগে কখনোই এতটা মনোনয়ন পেয়েছে এমন কিছুর ধারেকাছে থাকেনি। এই অর্জন বাংলোয় নির্মিত সিনেমার জন্য স্বাভাবিকভাবেই গৌরবের বিষয়।
রায়ান কুগলার পরিচালিত এই সিনেমা, যা গত বছরের শেষে মুক্তি পেয়েছে, তখন থেকেই দর্শক ও সমালোচকদের মনোযোগ আকর্ষণ করে আসছে। অস্কারের ৯৭ বছরের ঐতিহ্যে এটি সর্বাধিক মনোনয়ন পাওয়ার রেকর্ড গড়ল। প্রথমে মনে করা হয়েছিল, এই চলচ্চিত্রটি হয়তো শিল্পের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে; তবে এর বিপরীতে এর সাংস্কৃতিক ও শিল্পগত মূল্য অনেকগুণ বেশি। ভ্যাম্পায়ার ঘরানার এই হরর সিনেমার সেটিং ইউগো সময়ের দক্ষিণ আমেরিকা, যেখানে কৃষ্ণাঙ্গ অভিনেতা-অভিনেত্রীদের আধিপত্য রয়েছে। হালকা গাঢ় আইম্যাক্স ৭০ মিলিমিটার চিত্রায়ণ এই সিনেমাকে দিয়েছে অতিরিক্ত এক উজ্জ্বলতা। মার্ভেলের ‘ব্ল্যাক প্যান্থার’ এর পরিচালক রায়ান কুগলার এই সিনেমার মাধ্যমে এক সাহসী উদ্যোগ গ্রহণ করেন, যা শুরুতে অনেকেরই সন্দেহের তৈরি করেছিল।
প্রায় ১০ কোটি ডলার বাজেটের এই সিনেমার চিত্রনাট্য দুই মাসের মধ্যে লেখা হলেও, অনেকের ধারণা ছিল তিনি তার সীমার বাইরে গিয়ে যাচ্ছেন, বিশেষ করে ওয়ার্নার ব্রাদার্সের সঙ্গে তার চুক্তির জন্য। অতপর, ২০২৫ সালের এপ্রিলে ইস্টার উইকএন্ডে মুক্তি পেয়ে ‘সিনার্স’ বিশ্বজুড়ে ৩৬৮ মিলিয়ন ডলার আয় করে সকলের প্রত্যাশা ছাড়িয়ে যায়। এটি গত ১৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে সফল মৌলিক সিনেমা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যেখানে আবেগান্বিত কৃষ্ণাঙ্গ ইতিহাস ও সংস্কৃতি রাজনৈতিকভাবে আক্রমণের সম্মুখীন, সেখানে এই ছবি পুনরায় সেই অবমূল্যায়িত শেকড় ও বিনোদন শিল্পের রাজনীতির আলোচনা তুলেছে।
সিনেমার চিত্রনাট্য দ্রুত লেখা হলেও এর পেছনে গভীর গবেষণা কাজ করেছে। গল্পের কেন্দ্রে ছিল মিসিসিপি ডেল্টার লোককথা, দাসপ্রথা পরবর্তী সংস্কৃতি, ব্লুজ সংগীতের ইতিহাস ও এর উপেক্ষিত অঙ্গুলিরেল। কুগলার সেই সময়ের আলোকচিত্র, অভিবাসী ইতিহাস, এবং ১৯৩০ এর দশকের ঘটনার বিবরণকে খুব শিল্পোৎকৃষ্টভাবে যুক্ত করেছেন। অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে হেইলি স্টেইনফেল্ড ‘মেরি,’ ডেলরয় লিন্ডো ‘ডেল্টা স্লিম,’ এবং উনমি মোসাকুর অসাধারণ পারফরম্যান্স দর্শকদের মনে দাগ কেটেছে। বিশেষ করে মাইকেল বি. জর্ডান তার দ্বৈত চরিত্রে এক অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন, যা তার ক্যারিয়ারে অন্যতম সেরা। গিটার ও সংগীতের মাইলস ক্যাটন এই সিনেমার প্রশংসা করে বলেছেন, ‘মাইকেল যেভাবে দুই চরিত্র আলাদাভাবে জীবন দিয়েছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।’
‘সিনার্স’ কোনও নির্দিষ্ট ঘরানার মধ্যে বাঁধা নয়। এটি একপাশে হরর, অন্যদিকে মিউজিক্যাল, গ্যাংস্টার থ্রিলার ও ঐতিহাসিক ড্রামার দিক থেকেও সমৃদ্ধ। একে কোনও পূর্বনির্ধারিত গল্পের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়নি, তাই দর্শকদের জন্য নতুন কিছু দেখার সুযোগ হয়েছে। কুগলার এটিকে তার প্রয়াত মামার প্রতি ‘প্রেমের এক চিঠি’ বলে উল্লেখ করেছেন, যেখানে তিনি কোনো আইপি-কে ‘আড্ডা’ হিসেবে ব্যবহার করেননি। এই সিনেমা প্রেক্ষাগৃহে এবং স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম উভয় প্ল্যাটফর্মে ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে।
সফলতার পর, কুগলার এক খোলা চিঠিতে লেখেন, ‘আমি সিনেমাতে বিশ্বাস করি। আমি প্রেক্ষাগৃহে সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতায় বিশ্বাস করি। এটি সমাজের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। দর্শকদের প্রতিক্রিয়া আমাকে এবং চলচ্চিত্রের শিল্পকে নতুন জীবন দিচ্ছে।’ এখন দেখার বিষয়, এই রেকর্ড গড়া সিনেমাটি আসলে কতগুলো অস্কার পুরস্কার নিজেদের করে নেয়।






