আসন্ন পবিত্র রমজান মাস এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে অসাধু ব্যবসায়ীদের মধ্যে চীনাচুরি বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা একটি চতুর ও উদ্বেগজনক কৌশল অবলম্বন করছে, যার মাধ্যমে তারা নিত্যপণ্যসমূহের সরবরাহ চেনা স্বাভাবিক রাস্তা থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়। সাধারণত রমজানে পণ্যের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্থলভিত্তিক গুদামে পণ্য মজুতের প্রবণতা দেখা যেত, কিন্তু এবার নদীপথে ভাসমান লাইটার জাহাজগুলোকে অস্থায়ী গুদাম হিসেবে ব্যবহার করে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করার চেষ্টা চলছে। নারায়ণগঞ্জ, যশোর ও নোয়াপাড়া এলাকার নদীতে এই ধরনের অসংখ্য জাহাজ পণ্য খালাস না করে দীর্ঘদিন ধরে নোঙর করে রাখা হয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠছে। এই কৌশলের মূল উদ্দেশ্য হলো বাজারে অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি করে মূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করা।
রাজধানী করোয়ান বাজারসহ দেশের অন্যান্য প্রধান পাইকারি বাজারগুলোতেও এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে। যদিও সাধারণত পণ্যের সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি না থাকলেও ছোলা, চিনি ও ভোজ্যতেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ক্রমশ বাড়ছে। ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করছেন, আমদানিকারকরা পরিকল্পিতভাবে বন্দর থেকে পণ্য খালাসের প্রক্রিয়াকে ধীর করছেন, লাইটার জাহাজে পণ্য আটকে রাখছেন। এর ফলে বাজারে স্বাভাবিক পণ্যের প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং কৃত্রিম সংকটের সৃষ্টি হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের নজরে আসার পর নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দফতর সক্রিয় হয়ে উঠেছে। রমজান ও নির্বাচনের সময় অটুট পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে একটি ছয় সদস্যের বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড, নৌ-পুলিশ ও অভ্যন্তরীণ নৌযান পরিদর্শন দফতরের প্রতিনিধি রয়েছেন। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জেলা প্রশাসনের সহায়তায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা হবে। ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহৃত জাহাজের মালিক ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে প্রশাসন।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, রমজান উপলক্ষে আমদানিকারকরা বিপুল পরিমাণ পণ্য একসঙ্গে আমদানি করছে, যার ফলে বহিঃনোঙর বাণিজ্যিক জাহাজের ভিড় বেড়েছে ও পণ্য খালাসের জন্য লাইটার জাহাজের সংকট দেখা দিয়েছে। তবে এই পরিস্থিতিকে সুবিধা নিয়ে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে পণ্য আটকে রাখছে কি না, তা তদন্তে নেমেছে টাস্কফোর্স। যদিও লাইটার জাহাজ মালিক সমিতি দাবি করছে, তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নতুন এবং বেশিরভাগ জাহাজ বিভিন্ন শিল্পের নিজস্ব প্রয়োজনেই ব্যবহৃত হচ্ছে। অন্যদিকে, বৃহত্তর আমদানিকারকরা বলছে, পণ্য খালাসে অল্প সময়ের বিলম্ব স্বাভাবিক, এটা কোনো বড় সমস্যা নয়।
সরকার পরিষ্কারভাবে জানিয়েছে, ‘খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন, মজুত, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন’ সংক্রান্ত আইনের আওতায় অতিরিক্ত পণ্য মজুত করা গুরুতর অপরাধ। ভাসমান জাহাজ বা অন্য কোনোভাবে অবৈধভাবে মজুতের প্রমাণ পেলে সংশ্লিষ্টদের সর্বোচ্চ सাজার ১৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বাধ্যতা রয়েছে। এসব অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি ও প্রয়োজনীয় অভিযান চালিয়ে বাজার স্থীতিশীলতা ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার।






