চট্টগ্রাম বন্দর আজ তৃতীয় দিনের মতো অচল হয়ে পড়েছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ। বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব বর্তমানে দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’-এর হাতে হস্তান্তরের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শ্রমিক-কর্মচারীরা লাগাতার কর্মবিরতি চালিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে, এই দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি ও আমদানি কেন্দ্রের কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। সোমবার সকাল ৮টা থেকে শুরু হওয়া এই কর্মবিরতিতে একটি বড় অংশের শ্রমিক ও দাপ্তরিক কর্মচারীরা অংশগ্রহণ করেছেন, যার ফলে বন্দরের কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এর আগে শনিবার ও রবিবারও ই একই সময়ে তারা সফলভাবে কর্মবিরতি পালন করেছেন এবং তাদের মূল দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবার ঘোষনা দিয়েছেন।
অবস্থা সরেজমিনে দেখা গেছে, বন্দরের জেটিতে অবস্থানরত জাহাজগুলো থেকে পণ্য খালাসের কাজ বন্ধ রয়েছে। নতুন কনটেইনার লোডিংও বন্ধ, এবং বন্দরের ইয়ার্ড থেকে ট্রাক বা ক্যার্শভ্যানের মাধ্যমে পণ্য পরিবহন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে বন্দরের সড়কগুলো ছিল সম্পূর্ণরূপে যানবাহন মুক্ত। চট্টগ্রাম বন্দর বার্থ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, শ্রমিকরা কাজের জন্য বুকিং করলেও তারা কাজ করতে না চাওয়ায় বন্দরের কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে স্থবির হচ্ছে। শুধু শ্রমিকরা নন, দাপ্তরিক কর্মচারীরাও ‘কলম বিরতিতে’ থাকায় প্রশাসনিক কাজও বন্ধ হয়ে গেছে।
এখনকার মূল কারণ হলো, বর্তমান সরকার কর্তৃক চট্টগ্রাম বন্দরের ৪০ শতাংশ কনটেইনার হ্যান্ডলিংকারী এনসিটি টার্মিনাল বিদেশি এক সংস্থাকে লিজ দেওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ। শ্রমিক নেতাদের দাবি, এই টার্মিনালটি ২০০১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার উদ্যোগে স্থাপন হয়েছিল এবং ২০০৭ সালে নিজস্ব অর্থায়নে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবল দিয়ে পরিচালিত হয়। তারা বলছেন, এখানে কোনো নতুন বিদেশি বিনিয়োগের প্রয়োজন নেই, কারণ এটি ইতিমধ্যে আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন এবং স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত। বিদেশিদের হাতে এটি দিলে দেশের নিরাপত্তা ও রাজস্বের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি হবে বলে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
এই পরিস্থিতিতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে প্রশাসন। গত দুই দিনে, আন্দোলনে জড়িত থাকার অভিযোগে কমপক্ষে ১৬ জন শ্রমিক ও কর্মচারীকে ঢাকার আইসিডি ও নারায়ণগঞ্জের পানগাঁও টার্মিনালসহ অন্যান্য স্থানে বদলি করা হয়েছে। তবে, এই বদলি আদেশ আন্দোলন আরও জোরদার করেছে। আন্দোলনরত শ্রমিকরা দাবি করেছেন, যতক্ষণ না তাদের দাবি মানা হয় বা বদলির আদেশ প্রত্যাহার করা হয়, ততক্ষণ তারা নীরব protests চালিয়ে যাবেন। বন্দর রক্ষা সংগ্রাম কমিটি ও শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ এই আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
অন্যদিকে, বন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম সচল রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অবস্থানে রয়েছে। পুলিশ প্রশাসন এক গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বন্দর ও আশপাশের এলাকা এক মাসের জন্য সভা, মিছিল এবং শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। জননিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে, আন্দোলনকারীরা শান্তিপূর্ণ অবস্থানে থেকে প্রতিবাদ চালিয়ে যাচ্ছেন। দীর্ঘ দিনের এই অচলাবস্থার কারণে বাংলাদেশের বাইরেও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হতে পারে, এবং কোটি কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতির শঙ্কা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা দ্রুত অবাধ বৈঠকের মাধ্যমে একটি স্থায়ী সমাধান 찾ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।






