মহান ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবাহী ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিনে অন্ধকারের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ আলোয় আলোর ডাক দিয়ে শুরু হলো ৩৮তম জাতীয় কবিতা উৎসব। সংগীত, কবিতা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে মানুষের মনোভাব প্রকাশের এই অন্যতম সংগঠন ‘জাতীয় কবিতা পরিষদ’ এই দুই দিনব্যাপী এই আয়োজনের আয়োজন করেছে। এবারে এই উৎসব প্রথমবারের মতো রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) সকালে ঢাকাস্থ কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে এই উৎসবের সূচনা করা হয়।
স্মরণীয় দিনটির সূচনা ঘটে সমাধি প্রাঙ্গণ থেকে একটি রঙিন শোভাযাত্রার মাধ্যমে। কবিরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ও লালন সাঁইয়ের রক্তাক্ত প্রতিকৃতি এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুলের কারারুদ্ধ ছবি সম্বলিত প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে নানা প্রতিবাদী স্লোগান দিতে থাকেন। তাদের মুখে ছিল লাল কাপড় বেঁধে সাম্প্রদায়িকতা ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ভাষা। শোভাযাত্রা শহীদ মিনারে পৌঁছানোর পর সেখানে আবহমান বাংলার সংস্কৃতির নানা দিকের প্রতীক।
উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীত ও পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এরপর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গান ও এবারের উৎসবের মূল সংগীত ‘এ সংগীত নৃত্য কবিতা/এ সম্প্রীতি সাম্যের বারতা’ পরিবেশিত হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সর্বর ফারুকী। তিনি বলেন, কবিরা কবিতার মাধ্যমে মানুষের আবেগ ও মনোভাব প্রকাশ করেন। মানবতার জন্য কাজ করে এই জীবন সংগ্রামে সবাইকে একসঙ্গে থাকতে হবে। শহীদদের স্বপ্ন পূরণের জন্য সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে, কারণ তারা আমাদের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। দিনশেষে সবাই একসাথে মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তুলবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সংস্কৃতি উপদেষ্টা আরও বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়ের চেতনা আজও আমাদের প্রেরণা দেয়। এই চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমাদের সকলের উচিত বৈচিত্র্য ও সাম্প্রদায়িকতা এড়িয়ে একতা ও সহনশীলতার পথে এগিয়ে যাওয়া।
প্রসঙ্গত, কবিতা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন বলেন, ইতিহাসে যত সংকট এসেছে, তখনই কবিরা সর্বপ্রথম সোচ্চার হয়েছেন। এই সংগঠন রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণে নয়, বরং বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় কাজ করে আসছে। আগামীর কঠিন সময়ে দেশের কল্যাণে সব মত ও সমাজের সকল গোষ্ঠীর অংশগ্রহণের জন্য তাঁদের আহ্বান জানানো হয়।
সমাপনী বক্তব্যে কবি মোহন রায়হান জানান, এই ঐতিহ্যবাহী উৎসবের সূচনা ১৯৮৭ সালে। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রেরণা ছিল এই কবিতা ও সংস্কৃতি। তবে এবার এই আয়োজনটির অনুমতিতে কিছুটা সমস্যা দেখা দিলো। কারণ, বর্তমান সময়ের পরিবর্তন ও আধুনিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে অনেক বার এপ্রসঙ্গে অন্ধকারের অশুভ শক্তির আঘাত লক্ষ্য করা যায়। তারা বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্যকে ধারণ করতে অপারগ এবং এই অশুভ শক্তির প্রবলতা দিন দিন বেড়ে চলেছে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন কবি এ বি এম সোহেল রশিদ, শোকপ্রস্তাব পাঠ করেন কবি শ্যামল জাকারিয়া, এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন কবি নূরুন্নবী সোহেল। সবশেষে বিজ্ঞপ্তি ও ঘোষণাপত্র পড়ে শোনানো হয়।






