আগামী ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের আভাস মিলেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সাবেক আওয়ামী লীগ সমর্থকদের এক বড় অংশ বর্তমানে বিএনপির প্রতি ঝুঁকেছেন। প্রতিবেদনের তথ্যে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সমর্থকদের প্রায় ৪৮ শতাংশ এখন বিএনপিকে তাদের প্রধান রাজনৈতিক পছন্দ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যেখানে অন্যদিকে ৫২ শতাংশ ভোটার এখনো বিভিন্ন দলের দিকে মনোযোগী। এটি বোঝায় যে, ঐতিহ্যগতভাবে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের মধ্যে একটি দৃঢ় ভিত্তি থাকলেও, বর্তমানে কিছু অংশ তাদের মনোভাব পরিবর্তন করে অন্য দলের দিকে ঝুঁকেছেন। এই ফলাফল প্রকাশের জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে একটি সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ‘আনকাভারিং দ্য পাবলিক পালস’ শীর্ষক এই গবেষণার বিস্তারিত ফলাফল তুলে ধরা হয়। এই সমীক্ষা পরিচালনা করেন কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিআরএফ) এবং বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক ওপিনিয়ন স্টাডিজ (বিইপিওএস)।
গবেষণার নির্ভরযোগ্যতা ও বিস্তারিত রিপোর্ট লেখক ও গবেষক জাকারিয়া পলাশ উপস্থাপন করেন, যারা ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মোট ১১ হাজার ৩৮ জন ভোটারের তথ্য সংগ্রহ করেন। এই জরিপের মাধ্যমে ২০২৬ সালের নির্বাচনে ভোটারদের মনোভাব, অংশগ্রহণের প্রস্তুতি এবং রাজনৈতিক পরিবেশের ছবি আঁকার চেষ্টা করা হয়েছে।
মহামারী বা রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝে নতুন ভোটারদের মধ্যেও বেশ উৎসাহ দেখা গেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালের পর প্রথমবার ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন এমন ভোটারদের মধ্যে ৩৭.৪ শতাংশ জামায়াতে ইসলামীকে পছন্দ করেন। সমীক্ষায় দেখা গেছে, মোট ভোটারদের মধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি ভোট দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, যদিও প্রায় ৮ শতাংশ এখনো ভোট দেওয়ার ব্যাপারে দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছেন। এ ক্ষেত্রেও লিঙ্গ, বয়স বা ভৌগোলিক অবস্থানের কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব দেখা যায়নি।
জনমত অন্বেষণে ইস্যুতালিকা অনুযায়ী, দেশের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো দুর্নীতি এবং সুশাসনের অভাব। জরিপে অংশ নেওয়া ৬৭.৩ শতাংশ ভোটার বলছেন, দুর্নীতিই দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা। ধর্মীয় বিষয়গুলোর মধ্যে, মাত্র ৩৫.৯ শতাংশ ভোটার এই বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছেন। সুতরাং ভোটাররা এখন এমন নেতৃত্ব চাইছেন, যা শুধু ব্যক্তিগত ক্যারিশমা নয়, বরং জনদরদী ও সাধারণ মানুষের সমস্যা সমাধানে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। বর্তমানে টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সবচেয়ে শক্তিশালী সূত্র হিসেবে দাঁড়িয়েছে রাজনৈতিক তথ্য জানার জন্য।
নির্বাচনের সময় নিয়ে আরও কিছু উদ্বেগের বিষয় উঠে এসেছে। ভোটাররা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, নির্বাচন পরিচালনা নয় বরং কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ভয়ভীতি, জালিয়াতি ও ব্যালট দখলের ঝুঁকি এই সময়ের বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন দল ও প্রার্থী সম্পর্কে নির্বাচনী পরিস্থিতি সম্পর্কিত নজরদারিও নতুন ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। বিশেষ করে, প্রার্থী ও দলের যোগ্যতাকেও এখন বড়ো এক ফ্যাক্টর হিসেবে দেখা হচ্ছে। জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, ৩০.২ শতাংশ ভোটার শুধু প্রার্থীর যোগ্যতা দেখে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, আর অন্য ৩৩.২ শতাংশ ভোটার দুই বিষয়—প্রার্থী ও দল—দুটিই বিবেচনা করে থাকেন। সামগ্রিকভাবে, এই জরিপ আসন্ন নির্বাচনের আগে দেশের রাজনৈতিক মঞ্চে পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত প্রদান করছে এবং ভবিষ্যতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কতটা বদলে যেতে পারে, তার একটি আভাস দিচ্ছে।






