রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার চরাঞ্চল ও আশপাশের ব্যস্ত সবজি ক্ষেতগুলোতে ফসল রক্ষার নামে ব্যবহার করা হচ্ছে কারেন্ট জাল। কৃষকরা পাখি ঠেকাতে এসব জাল ব্যবহার করছেন; ফলে নির্বিচারে আটকা পড়ে মারা যাচ্ছে শালিক, দোয়েল, বুলবুলি, পেঁচা, চড়ুই, কবুতরসহ নানা প্রজাতির পরিবেশবান্ধব পাখি। পরিবেশবিদরা ও পাখিপ্রেমীরা বলছেন, এই অতিমাত্রায় পাখি হত্যার ফলে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে।
স্থানীয়রা জানান, চরাঞ্চল ও অন্যান্য এলাকায় বেগুন, টমেটোসহ নানা সবজির মাছুলজমিনে পাখির আক্রমণ থাকে। ফসল রক্ষার জন্য কৃষকরা বিভিন্ন ব্যবস্থা নেন—খুঁটি পুঁতে রঙিন ফিতা ঝুলানো, টিনের কৌতুক বাজানো, কাকতাড়ুয়া স্থাপন ইত্যাদি। কিন্তু অনেকেই এখন মাঠ ঘিরে কারেন্ট জাল ছেঁড়ে দিচ্ছেন। জালে আটকে পাখি সারাদিন কিংবা রাতে মারা যাচ্ছে।
দৌলতদিয়া ইউনিয়নের চরকর্ণেশন এলাকার কৃষক মো. ওমর আলি বলেন, তিনি দুই বিঘা জমিতে বেগুনের চারা তুলেছেন। কষ্ট করে ভালো ফলন পেয়েছেন, কিন্তু পাখির কারণে অনেক বেগুন নষ্ট হচ্ছে। ‘‘বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেও পাখি ঠেকাতে পারিনি, তাই বাধ্য হয়ে কারেন্ট জাল দিয়েছি। জালে কেউ আটকা পড়লে ছাড়াও দিই,’’ তিনি জানান।
আক্কাস আলী হাইস্কুল সংলগ্ন এলাকার কৃষক মোবারক খাঁ জানান, কিছু পাখি ক্ষতি করলেও অনেক প্রজাতির পাখি ক্ষতিকর পোকা খেয়ে ফসল রক্ষা করে। তিনি বলছেন, ‘‘কোনো পাখিকে হত্যা করে ফসল রক্ষা করা যুক্তিযুক্ত না। বিকল্প আছে—ক্ষেতের চারপাশে ও মাঝে খুঁটি পুঁতে রঙিন পাতলা ফিতা টানালে বাতাসে ফিতার ভনভন শব্দে পাখির উপদ্রব অনেকাংশে কমে।’’
আরেক কৃষক জানান, তিন বিঘা জমিতে টমেটো ফলিয়েছেন। বাজারে দামও ভালো পেয়েছেন, কিন্তু পাখি ঠেকাতে ক্ষেত জালে ঢেকে দেওয়ায় রাতে বহু পাখি আটকে মারা গেছে। ‘‘কি করবো, পাখির উপদ্রব বন্ধ করতে আমাদের এই ব্যবস্থা নিতে হয়,’’ তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।
স্থানীয়রা আরও জানান, গোয়ালন্দ নদীর নিকটবর্তী হওয়ায় জেলেদের কাছ থেকে সস্তায় পুরনো কারেন্ট জাল পাওয়া যায়; ফলে কৃষকরা সহজেই এসব জাল সংগ্রহ করে ব্যবহার করছেন। কিন্তু অনেক পাখিই বেগুন-টমেটো খায় না—তবু তারা জালে নিপীরিত হচ্ছে।
পাখি রক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পাখিপ্রেমীরা অভিযোগ করেছেন যে, সংশ্লিষ্টরা—স্থানীয় প্রশাসন ও বন বিভাগ—এই বিষয়ে নীরব রয়েছেন। দ্রুত পদক্ষেপ না হলে ফসল রক্ষার নামে পাখি নিধন অব্যাহত থাকবে, তাদের আশঙ্কা। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী নির্বিচারে বন্যপ্রাণী হত্যার অভিযোগ দণ্ডনীয়, তবু এ ধরনের কোনো কার্যকর অনুসন্ধান বা সচেতনতা মূলক উদ্যোগ দেখা যায়নি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রায়হানুল হায়দার বলেন, ‘‘ফসলের উৎপাদন জরুরি হলেও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাও সমান প্রয়োজন। পাখি ফসলের ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে অনেক উপকার করে। তাই কারেন্ট জালের মতো মৃত্যু ফাঁদ ব্যবহার করা উচিত নয়। তবে বহু ক্ষেত্রেই বিকল্প পদ্ধতি কাজে না লাগায় কৃষকরা বাধ্য হয়ে এই পথ অবলম্বন করছেন—এজন্য কৃষি বিভাগ কৃষকদের পরামর্শ ও সচেতন করতে কাজ করে যাচ্ছে।’’
পরিবেশবিদরা দাবি করেন, স্থানীয় প্রশাসন, বন বিভাগ ও কৃষি বিভাগ মিলে দ্রুত মাঠ পর্যায়ে অভিযান চালিয়ে কারেন্ট জাল সরিয়ে নেওয়া, কৃষকদের বিকল্প নির্বিশেষে সচেতন করা ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করলে পাখি রক্ষা সম্ভব। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় আর সবজি উৎপাদন—দুইয়ের মাঝেই সমন্বয় আনা প্রয়োজন, তাদের মত।






