পরমাণু ইস্যু নিয়ে জেনেভায় দ্বিতীয় দফার বৈঠকে বসতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। বৈঠকে যোগ দিতে ইতোমধ্যে জেনেভায় পৌঁছেছেন ইরানের উপরের্যায় কূটনীতিক আব্বাস আরাঘচি। ওমান মধ্যস্থতায় হওয়া এই উচ্চ পর্যায়ের আলোচনায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘পরোক্ষভাবে’ যুক্ত থাকার কথা জানিয়েছেন।
পূর্বের ওমান-মধ্যস্থ প্রথম দফার আলোচনায় তেহরান ৬০ শতাংশ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কমানোর অঙ্গীকার করেছিল। এবার আরাঘচি জোর দিয়েছেন যে ইরান ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক একটি চুক্তি চাইছে এবং তার জন্য বাস্তবসম্মত প্রস্তাব নিয়ে এসেছে। পাশাপাশি ইরান স্পষ্ট করেছে যে নিষেধাজ্ঞা শিথিল না হলে কোনো সমঝোতায় বসবে না এবং সমঝোতাটি ‘‘দেওয়া-নেওয়ার’’ ভিত্তিতে হবে; শূন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের দাবি তারা মানবে না।
বৈঠকের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল-বুসাইদি থাকবেন বলে জানানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আলোচনায় বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং সম্ভাব্যভাবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার উপস্থিত থাকতে পারেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারকো রুবিও বলেছেন, কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ থাকলেও চুক্তি করা কঠিন হবে; তবু তারা আশা করে ইরান যৌক্তিক পথে আসবে।
ট্রাম্প গত সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) জানান, জেনেভায় হওয়া মঙ্গলবারের (১৭ ফেব্রুয়ারি) গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় তিনি ‘পরোক্ষভাবে’ যুক্ত থাকবেন এবং এগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ হবে—এমনকি তিনি আশা প্রকাশ করেছেন যে ইরান চুক্তি করতে চায়।
আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-র প্রধান রাফায়েল গ্রোসির সঙ্গে সাক্ষাৎকালে ইরান আইএইএকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক স্থাপনার পরিদর্শন ও প্রবেশাধিকার দেওয়া হোক; তবে তেহরান দাবি করেছে যে বিকিরণের ঝুঁকি থাকার কারণে নির্দিষ্ট প্রটোকল মেনে নিরাপদভাবে পরিদর্শন করতে হবে। তেহরান আইএইএকে জানিয়েছে যে আইএইএ যদি মার্কিন ও ইসরায়েলের হামলার নিন্দা না জানায়, তাতে তারা অসন্তুষ্ট।
সেনা ও সামরিক মোতায়েনের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে বিশাল নৌবহর পাঠিয়েছে। ইতিমধ্যে পারস্য উপসাগরের কাছে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন এবং ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডসহ বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন রয়েছে বলে নজর রাখা হচ্ছে। এসবের জবাবে ইরান সতর্ক করে বলেছে, যদি হুমকি করা হয় তারা মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করবে।
ইরানও তার সামরিক প্রস্তুতি বাড়িয়েছে। পারস্য উপসাগরে ‘স্মার্ট কন্ট্রোল অব দ্য স্ট্রেইট অব হরমুজ’ নামে নৌমহড়া শুরু হয়েছে; দেশের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম মেহর নিউজ জানিয়েছে যে মেজর জেনারেল মোহাম্মদ পাকপুরের তত্ত্বাবধানে নৌবাহিনী এই মহড়া পরিচালনা করছে।
এদিকে অঞ্চলীয় প্রতিক্রিয়িতেও উত্তেজনা দেখা গেছে। আফগানিস্তানের তালেবান দাবি করেছে যে, যদি ইরানের ওপর আক্রমণ হয় তবে আফগানিস্তানের কিছু গোষ্ঠী ইরানকে সহায়তা করবে; তবে তারা জোর দিয়েছে যে তারা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অংশগ্রহণের ঘোষণা দেয়নি এবং যুদ্ধের বদলে কূটনৈতিক সমাধানকেই অগ্রাধিকার দেবে। পূর্বে ইরানের পাশে ইরাকের শিয়া মিলিশিয়ারা সমর্থন জানিয়েছে, কিন্তু অন্যান্য কয়েকটি দেশ বা অঞ্চল সুস্পষ্ট সমর্থন দেয়নি এবং সকলেই উত্তেজনা কমিয়ে আলোচনা শুরু করার ওপর জোর দিয়েছে।
উপসংহারে, জেনেভায় অনুষ্ঠিত এই আলোচনাকে সবাই কূটনৈতিক এগিয়ে যাওয়ার একটি সুযোগ হিসেবে দেখছে—তবে নিষেধাজ্ঞা শিথিল, নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণ ও পারস্পরিক আস্থা ফেরানো ছাড়া চুক্তি করা কঠিন হবে বলে প্রতিটি পক্ষের অবস্থানই ইঙ্গিত করে।






