নব নির্বাচিত সরকারের শপথ গ্রহণের মাধ্যমে দেশটিতে আবারও পুনরায় গণতন্ত্রের শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া চলছে। এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে, বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস একটি দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। তিনি এবং তার মন্ত্রিসভার অন্তত ২০ জন উপদেষ্টা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ইতিমধ্যে তাঁদের কূটনৈতিক (লাল) পাসপোর্ট সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেছেন। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে তারা নিজেদের দায়িত্বশীলতা ও নৈতিকতার পরিচয় দিয়েছেন, যা সরকারের স্বচ্ছ ও সুনিশ্চিত ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য এক অনন্য নজির স্থাপন করে।
প্রায় এক সপ্তাহ আগে, নিজ সাধারণ সমাপ্তির অংশ হিসেবে, ড. ইউনূস তার পাসপোর্ট জমা দিয়েছিলেন। স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, এই উদ্যোগ সরকারের ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা এবং দায়িত্বশীল আচরণের প্রতিফলন। মূলত, বিদায়ী প্রশাসন এখন বাধ্য হচ্ছেন নিয়ম অনুযায়ী সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ পাসপোর্ট ও আনুষঙ্গিক কাগজপত্র ফেরত দিতে, যা দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ জনগণের কাছে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেয়।
অতীতে, এই পাসপোর্টগুলো জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করেছেন সরকারি উচ্চপদস্থ আরও বেশ কিছু উপদেষ্টা। বিধি অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকাকালীন প্রাপ্ত সুবিধাগুলি শেষ হলে, দায়িত্ব শেষে এই সকল সুবিধা ও পাসপোর্ট ফিরিয়ে দিতে হয়। এই নৈতিক ও আইনি দিক দিয়ে বাধ্যবাধকতা থেকেই তারা এই পদক্ষেপ নিয়েছেন।
তালিকায় উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল আর খাদ্য ও ভূমি উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার। এছাড়াও, শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার, গৃহায়ন ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দারসহ আরও অনেক একজন তাদের পাসপোর্ট ফিরিয়ে দিয়েছেন।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপদেষ্টা বীরপ্রতীক ফারুক-ই-আজম, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, সাবেক বাণিজ্য ও শিল্প উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ও তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানও তাঁদের লাল পাসপোর্ট ফিরিয়ে দিয়েছেন। এছাড়া আরও অনেক বিশিষ্টজন, যেমন সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম, সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও নারী ও শিশু বিষয়ক উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ, তাদের দায়িত্ব শেষ করে পাসপোর্ট ফেরত দিয়েছেন।
প্রশাসনিক ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ব্যক্তিদের মধ্যে, প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী ও ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবও তাঁদের পাসপোর্ট ফিরিয়ে দিয়েছেন। এর পাশাপাশি, ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধি হিসেবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অংশ ছিলেন মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তাঁরা ক্ষমতা হস্তান্তরের পর দ্রুতই এই আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেছেন। সরকারের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে, যারা এখনও পাসপোর্ট হস্তান্তর করেননি, তাঁদের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা রয়েছে এবং সেই সময়ের মধ্যে সকলকেই এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
অতীত ১৮ মাসে দেশের শাসনামল নতুন নির্বাচিত সরকারের হাতে হস্তান্তর পাওয়ার এই দীর্ঘ পথে, বিদায়ী উপদেষ্টাদের এই পেশাদারী ও নিয়মতান্ত্রিক আচরণ প্রশাসনিক মহলে সুপ্রতিষ্ঠিত এক ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এটি দেশের গণতান্ত্রিক ধারা বজায় রাখতে ও সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ সুস্পষ্ট বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।






