মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা এবং ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে চলমান আলোচনা অচলাবস্থার কারণে বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ফের উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দুই প্রধান সূচকই উল্লেখযোগ্যভাবে উর্ধ্বমুখী হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বক্তা দিনে ব্রেন্ট ফিউচার তেলের দাম পরে ব্যারেলপ্রতি ২৪ সেন্ট বা দশমিক ৩ শতাংশ বাড়ে, যার ফলে এই সময় এর মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৭০.৫৯ ডলারে। একই সময়ে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম ২৮ সেন্ট বা দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৬৫.৪৭ ডলারে পৌঁছেছে। উল্লেখ্য, গত বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, যা ৩০ জানুয়ারির পর সর্বোচ্চ স্তরে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অস্থিরতার পেছনে মূল কারণ হলো ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা। বিশেষ করে, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে যদি কোনও কারণে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয়, তবে তা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। কারণ, বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। এর আগে মঙ্গলবার, ইরান কয়েক ঘণ্টার জন্য এই প্রণালিটি বন্ধ করায় বিশ্বজুড়ে সরবরাহের সমস্যা ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, ইরান তার স্পর্শকাতর এলাকা গুলিতে নতুন স্থাপনাব্যবস্থা তৈরি করছে এবং দক্ষিণ অঞ্চলে রকেট উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা করছে; এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্রও এই অঞ্চলে শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছে।
এছাড়া, জেনেভায় ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পের আলোচনা চালু থাকলেও, রয়েছে নীতিগত দূরত্বের কারণে বড় ধরনের সমাধান আসতে পারছে না। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, তেহরান পরবর্তী আলোচনার জন্য বিস্তারিত তথ্য নিয়ে ফিরতে পারে; তবে বর্তমান পরিস্থিতি ও অবিশ্বাসের বাতাবরণ বাজারের অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে তুলছে। নিসান সিকিউরিটিজের প্রধান কৌশলবিদ হিরোয়ুকি কিকুকাওয়ার মতামত, পরিস্থিতি গুরুতর হলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেলের দাম অতিরিক্ত বাড়ানোর পক্ষে নন, কারণ এতে মার্কিন অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে, সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপগুলিও সীমিত ও স্বল্পমেয়াদি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বৈশ্বিক তেলের বাজারের এই অস্থিরতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন সংকটের নতুন মোড়। জেনেভায় অনুষ্ঠিত সম্প্রতির শান্তি আলোচনা কোনো চূড়ান্ত ফলাফল ছাড়াই শেষ হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা নতুন করে শঙ্কায় পড়েছেন। পাশাপাশি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তেলের মজুতে আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়াও মূল্যবৃদ্ধির জন্য দায়ী। ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সপ্তাহে অপরিশোধিত তেলের মজুত বৃদ্ধির পূর্বাভাস থাকলেও, বাস্তবে পেট্রোল ও ডিস্টিলেটের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (ইআইএ) চূড়ান্ত প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষমাণ ব্যবসায়ীরা, যার ভিত্তিতে তেলের মূল্য আরও ওঠানামা করতে পারে। সরবরাহ ও চাহিদার এই তীব্র অসামঞ্জস্য বিশ্ব অর্থনীতির জন্য নতুন ও কঠিন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করে চলেছে।






