রমজান মাসে মুসলমানরা এক মাস ধরে রোজা পালন করেন—ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি হিসেবে রোজার বিশেষ গুরুত্ব আছে। তবে ইসলামের আগেই মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন ধর্ম ও সভ্যতায় উপবাস বা রোজার ধারণা দীর্ঘকাল ধরেই প্রচলিত ছিল। বিবিসি আরবি বিভাগের প্রতিবেদনকে ভিত্তি করে সেসব ইতিহাস সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।
প্রাচীন মিশর (ফেরাউন যুগ)
প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায় দেবতাদের অনুগ্রহ লাভ, আত্মশুদ্ধি ও কৃতজ্ঞতা জানানোর উদ্দেশ্যে নানা আচার-অনুষ্ঠান ছিল, যার মধ্যে উপবাসও একটি। বসন্ত উৎসব, ফসল উৎসব ও নীলনদের প্লাবন উৎসবের সময় মানুষ আত্মাকে পাপ ও ত্রুটি থেকে মুক্ত করার জন্য ক্ষুধা এবং অন্যান্য প্রবাস পারাপারের রীতি পালন করত।
প্রাচীন মিশরীয় উপবাসের ধরন নিয়ে প্রত্নতত্ত্ব ও গবেষকদের মধ্যে মতভেদ দেখা যায়—কিছু গবেষক মনে করেন এটি মূলত পুরোহিতদের সীমাবদ্ধ ছিল, আবার অনেকে সাধারণ মানুষের মধ্যেও এ রীতির প্রমাণ পান। কিছুর মতে উপবাস সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত চলত, আবার কিছু ক্ষেত্রে তিন থেকে সপ্তাশ দিন পর্যন্ত দীর্ঘকালীন উপবাসের প্রমাণও পাওয়া যায়। কিছু উপবাসে খাদ্য, পানীয় ও যৌন সম্পর্ক থেকে বিরত থাকতে হত; অন্যত্র মৃতদের আত্মার শান্তির জন্য সীমিত খাদ্যাভ্যাস (শাকসবজি ও পানি) গ্রহণের রীতিও ছিল।
জরথুস্ত্রবাদ ও ইয়াজিদি আচার-অনুষ্ঠান (প্রাচীন পারস্য ও কুর্দি অঞ্চলে)
জরথুস্ত্রবাদ প্রাচীন পারস্যের একটি প্রভাবশালী ধর্ম ছিল; এতে উপবাসকে সাধারণত নিরুৎসাহিত করা হতো। তাদের বিশ্বাস ছিল যে উপবাস শারীরিক শক্তি কমায় ও অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়ায়, ফলে সমাজে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
নির্দিষ্টভাবে ইয়াজিদিদের মধ্যে তিন দিনের রোজার রীতি প্রচলিত ছিল—সাধারণত মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এবং এটি সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পালন করা হতো। ইয়াজিদিদের মধ্যে দুইরকম রোজা ছিল: সাধারণ মানুষের জন্য সহজ ধরনের এবং ধর্মীয় ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ ধরনের রোজা; শিশু, অসুস্থ ও প্রতিবন্ধীদের জন্য অব্যাহতি ছিল। নিরিষ্ট কিছু অনুষঙ্গে দীর্ঘকালীন রোজা রাখা ও তাতে গর্ব করাসহ পবিত্রতা অর্জনের প্রচলন ছিল। ‘সাওম খুদান’ নামে কিছু পবিত্র ব্যাক্তি ও উদগ্রীব সাধকদের দ্বারা পালনীয় রোজার রেওয়াজও ছিল।
ইহুদিধর্ম
ইহুদিত্বে উপবাসের মধ্যে অন্যতম প্রধান উৎসব হলো ইয়োম কিপুর—প্রায়শ্চিত্ত ও শুদ্ধিকরণের দিন। ইয়োম কিপুর সাধারণত ২৬ ঘণ্টা চলা উপবাসের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয় এবং এটি ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে পবিত্র দিন। এই দিনে মানুষ পার্থিব ভোগ থেকে বিরত এসে ইবাদত, আত্মসমীক্ষা ও ক্ষমা প্রার্থনায় সময় কাটায়।
ইহুদি আইনে অসুস্থ ও গর্ভবতী নারীদের উপবাস থেকে অব্যাহতি আছে; সাধারণত শাব্বাত বা অন্যান্য উৎসবের ওপরেও উপবাস বিধি আলাদা। এছাড়া স্বেচ্ছায় উপবাস পালন করার রীতিও আছে—বিশেষ করে পাপপ্রায়শ্চিত বা কৃতজ্ঞতা ও প্রার্থনার উদ্দেশ্যে। আধুনিক ব্যাখ্যায় কখনও কখনও এমন সিদ্ধান্তও নেওয়া হয় যে গুরুত্বপূর্ণ কাজ বা নেতৃত্বের ক্ষেত্রে কর্মক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হলে উপবাস স্থগিত করা যেতে পারে।
খ্রিষ্টধর্ম
খ্রিষ্টধর্মে উপবাসকে সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য অর্জন, আত্মশুদ্ধি ও অনুশোচনার মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়। বাইবেলে দানিয়েল প্রভৃতির উপবাসের বর্ণনা আছে, যেখানে প্রার্থনা ও বিশুদ্ধতার লক্ষ্যে অনাহারে থাকা হয়েছে।
খ্রিষ্টান সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে উপবাসের নিয়ম ও সময় ভিন্ন—কোনো এক মাস বা দিনের জন্য নির্দিষ্ট বিধান সব গির্জায় নেই; তাই প্রচলনভেদে রীতিতেও পার্থক্য আছে। উদাহরণস্বরূপ, ইস্টারের আগে পালিত লেন্ট বা ৪০ দিনের পর্যায় অনেক গির্জায় উপবাস ও আত্মসংযমের সময় হিসেবে পালন করা হয়; কেউ কেউ প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় (যেমন বারো ঘণ্টা) খাদ্য থেকে বিরত থাকেন, আবার অনেকে দীর্ঘতর বা পালিত আচার অনুসরণ করেন।
উপসংহার
মধ্যপ্রাচ্যে রোজা বা উপবাসের রীতি কোনো এক ধর্ম-সংক্রান্ত আবিষ্কার নয়, বরং স্বতন্ত্র ধর্মীয় চেতনা ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে উন্নত হওয়া বহুবারের আচার। প্রত্যেক ধর্মই উপবাসকে আলাদা আঙ্গিকে গ্রহণ করেছে—কখনও আত্মশুদ্ধি, কখনও দেবতার নৈকট্য, আবার কখনও সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত বিবেচ্য বিষয় হিসেবে দেখেছে। ইসলামের আগের এই বহুমুখী ঐতিহ্যই পরবর্তীতে অঞ্চলের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও রোজার প্রথাকে প্রভাবিত করেছে।






