ইরানের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি আরও তৎপর হয়ে উঠেছে। মার্কিন নৌ ও বিমান বাহিনী ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরানে হামলার জন্য। মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা হয়েছে অত্যাধুনিক ও নজিরবিহীন সমরাস্ত্র। এই প্রেক্ষাপটে জানা গেছে, তারা নতুন এক ধরনের অস্ত্রও প্রস্তুত করেছে, যা আক্রমণে ব্যবহার করতে পারে ইরানের বিরুদ্ধে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের এবং বিশ্লেষকদের মতে, যদি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সিদ্ধান্ত নেন ইরানে হামলা চালানোর, তবে পেন্টাগনের প্রথম সারির আত্মঘাতী ড্রোন ইউনিট এই অভিযান অংশ নেবে। এই ড্রোন ইউনিটটির নাম ‘টাস্ক ফোর্স স্কর্পিয়ান’, যা মার্কিন সামরিক বাহিনীর পরীক্ষামূলক ড্রোন থেকে বিকশিত হয়েছে। ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স এক বিবৃতিতে বলেন, এই ইউনিট এখন আঞ্চলিক অপারেশনের জন্য প্রস্তুত।
তিনি আরও জানান, ‘আমাদের সেনাদের দ্রুত নতুন ড্রোন সক্ষমতায় সজ্জিত করতে গত বছর এই স্কোয়াড্রন গঠন করা হয়েছিল, যা ক্রমাগত উন্নত হচ্ছে।’ এই ‘ওয়ান-ওয়ে’ অ্যাটাক ড্রোনের এই ইউনিটটি বর্তমানে ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পরে নির্মিত সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক উপস্থিতির অংশ। মূলত, ইরানের পরমাণু পরিকল্পনাকে বাধা দিতে ট্রাম্প এর শক্তি বৃদ্ধির নির্দেশ দিয়েছিলেন।
অন্যদিকে, জেনেভায় মার্কিন ও ইরানি আলোচনা অব্যাহত ছিল। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি জানান, আলোচনা ভালো হয়েছে এবং অচিরে, সম্ভবত এক সপ্তাহের মধ্যে, নতুন দফার আলাপচারিতা হতে পারে।
গেল ডিসেম্বরে পারস্য উপসাগরে সফল পরীক্ষা চালানো হয় ড্রোনটি। ওই অঞ্চলের মোতায়েন মার্কিন নৌবহর ‘ইউএসএস সান্তা বারবারা’ জাহাজ থেকে এটি উৎক্ষেপিত হয়েছিল। ডিফেন্স অ্যানালিস্ট আনা মিসকেলি বলছেন, এই ইউনিটের মোতায়েন ইঙ্গিত দেয় যে, মার্কিন সেনারা এতদিনের মতো নির্ভরশীলতা কমানোর চেষ্টা করছে এমকিউ-৯ রিপারের মতো জটিল ও খরচসাধ্য প্ল্যাটফর্মের ওপর।
প্রতি ড্রোনের খরচ প্রায় ৩৫,০০০ ডলার যা স্পেকট্রেওয়ার্কস কোম্পানি তৈরি করে। এই লাইটওয়েট ড্রোন গুলো আত্মঘাতী, নজরদারি ও সামুদ্রিক হামলার কাজে ব্যবহৃত হয়। সেন্টকম বলছে, এই ড্রোনগুলো বেশি দূরত্বে চলতে পারে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে।
তবে, এই ইউনিট সামরিক অভিযানে মাত্র একটি ছোট অংশ হলেও, কোনও বড় আক্রমণে এর অংশগ্রহণ সম্পূর্ণ নতুন ঘটনা বলে মনে করে বিশ্লেষকরা। এর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ড্রোন ব্যবহারের গতি বাড়ানোর পরিকল্পনাও বাস্তবায়িত হতে পারে।
এই ড্রোনগুলো ইরানের ‘শহীদ-১৩৬’ ড্রোন থেকে রিভার্স-ইঞ্জিনিয়ারিং করে তৈরি বলে ধারণা, যা রাশিয়া ও ইরান ইউক্রেনসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে কামিকাজি ড্রোন ব্যবহারের পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন কিন্তু এই লক্ষ্য পূরণের জন্য চাই আরও জোরালো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
হাডসন ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক ব্রায়ান ক্লার্ক বলেন, এই লুকাশ ড্রোনগুলো ৪০ পাউন্ডের পেলোড নিয়ে খুব শক্তিশালী লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে পারে না। তবে, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র, সড়ক নেটওয়ার্ক এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ধ্বংসের জন্য এই ড্রোনগুলো কার্যকর হতে পারে। তিনি অবশ্যই বলেন, ‘ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা এখন আগের মতো কার্যকর নয়, তাই তারা সহজে এসব ড্রোন ভূপাতিত করতে পারবে না।’
এদিকে, দ্বিতীয় দফার আলোচনায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার নিয়ে আলোচনা চলেছে। পশ্চিমা শক্তিগুলো মনে করে, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বড় সামরিক হুমকি। ইরান স্বাভাবিকভাবেই বলে, তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ২০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত সীমিত। তবে বিস্তারিত গবেষণা ও গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরানের এখন শেষ পর্যন্ত অনেক বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার রয়েছে, যা ইসরাইলসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য এক বড় উদ্বেগের কারণ। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো বিভিন্ন ব্যাটারি ও ভৌগোলিক অবস্থানে ছড়িয়ে রয়েছে, যার মধ্যে তেহরান ও এর আশেপাশের বেশ কিছু ভূগর্ভস্থ ‘মিসাইল সিটি’ উল্লেখযোগ্য।
গবেষণা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ইরানের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে রয়েছে সেজিল, যার সীমা ২০০০ কিলোমিটার, এমাদ, গদর, শাহাব-৩, খোররামশাহর, হোভেইজেহ প্রভৃতি। ২০২৫ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরাইলের দিকে আঘাত হানার জন্য নয়টি ক্ষেপণাস্ত্র আছে ইরানের কাছে, যার মধ্যে সেজিলের গতিবিধি ঘণ্টায় ১৭,০০০ কিলোমিটার হারিয়ে পৌঁছাতে পারে ২,৫০০ কিলোমিটার দূরে। এই সব তথ্য দেখায়, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বিভাজন ও সক্ষমতা এখনো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।






