সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বলে, ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে সবচেয়ে বড় অন্তরায় দুর্নীতি। এ সমস্যা মোকাবিলায় সংস্থাটি কর ন্যায়পাল, ব্যবসাজনিত ন্যায়পাল ও ব্যাংক ন্যায়পাল—এই তিন ধরনের স্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক প্রতিষ্ঠা করার প্রস্তাব দিয়েছে।
শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সিপিডি কার্যালয়ে “নতুন সরকারের অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতে নীতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত: ১৮০ দিন ও তারপর” শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এসব সুপারিশ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ব্যবসা পরিচালনায় সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যাপক অপ্রাতিষ্ঠানিক লেনদেন থাকায় দুর্নীতি প্রসার পেয়েছে আর সেটাই বাণিজ্যিক কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে। তাই প্রত্যেক খাতে স্বতন্ত্র ন্যায়পাল নিয়োগ জরুরি এবং দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
ড. মোয়াজ্জেম জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় রাজস্ব আহরণ সবচেয়ে দুর্বল পর্যায়ে ছিল। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বর্তমানে বাংলাদেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত সবচেয়ে নীচু। বর্তমান সরকার রাজস্ব আহরণ ৪ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রেখেছে এবং দীর্ঘমেয়াদে ২০৩৫ সালের মধ্যে তা ১৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সম্পদ কর সংযোজনের প্রস্তাব থাকলেও কর ন্যায্যতা নিশ্চিত করার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বলেছেন তিনি।
দুর্নীতির সুযোগ সীমিত করতে কর বৈষম্য কমানো জরুরি—এই যুক্তিতে সিপিডি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-কে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করার পরামর্শ দিয়েছে। ওই কমিটি নিয়মিতভাবে কর অব্যাহতি, কর ফাঁকি, কর ছাড় ও কর আহরণ পর্যবেক্ষণ করবে।
ভ্যাট কাঠামো সহজ করার তাগিদ দিয়েছেন ড. মোয়াজ্জেম। বর্তমানে ভ্যাটে ৮টি স্ল্যাব আছে; ধাপে ধাপে স্ল্যাব কমিয়ে প্রথমে ৩টি এবং পরে ২টায় এনে একক হারে যাওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
এনবিআরের কর অবকাশ নীতিও পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন মনে করেন তিনি। বিনোদন ক্লাব বা পুঁজিবাজারের মতো খাতে দেওয়া কর অবকাশ সুবিধা পুনর্বিবেচনা করা উচিত। এছাড়া খাতভিত্তিক ও জ্বালানিভিত্তিক ছাড় তুলে দিয়ে সমন্বিত একক নীতির আওতায় সুবিধা দেওয়ার পরামর্শ দেন। ব্যক্তি শ্রেণি হলো-ব্যবসা নির্বিশেষে সব ধরনের করদাতার জন্য অনলাইন কর রিটার্ন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবও তিনি উপস্থাপন করেন।
ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য নির্দিষ্ট প্রণোদনা, আন্তর্জাতিক কর ফাঁকি রোধে বৈশ্বিক গাইডলাইন অনুযায়ী চুক্তি করা এবং এনবিআরের ভেতরে একজন স্বাধীন পরিচালক নিয়োগের কথাও বলেছেন তিনি। রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা—এই দুই ভাগে বিভক্ত কাঠামোকে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতেই বলে সিপিডি।
ব্রিফিংয়ে সংস্থাটি সতর্ক করেছেন যে, নতুন সরকারের শুরুর সময়ে ঘোষিত নীতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নে ধারাবাহিকতা না থাকা এবং প্রশাসনিক অনাগ্রহ, আইনি জটিলতা ও নির্বাচনী অঙ্গীকার থেকে সরে যাওয়ার প্রবণতা বড় সমস্যা। তাই বিকেন্দ্রীকৃত, জ্ঞানভিত্তিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নীতি বাস্তবায়ন কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে। জাতীয় সংসদের কার্যকর তদারকির ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
সিপিডি তাদের গবেষণার ভিত্তিতে মোট ১২টি অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতে সরকারের নীতি ও প্রশাসনিক করণীয় চিহ্নিত করেছে। সংস্থাটি আশা করে, এই সুপারিশগুলো বাস্তবায়িত হলে ব্যবসায়িক পরিবেশে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং অর্থনীতির রাজস্বভিত্তি শক্তিশালী হবে।






