জাতীয় পর্যায়ে তেলের কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগ বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার আশংকায় অনেক ক্রেতা ও ব্যবসায়ী হঠাৎ বেশি করে তেল কিনে মজুত করছে—ফলে একদিকে দীর্ঘ লাইন, অন্যদিকে খুচরা বাজারে দর বেড়ে যাওয়ার ঘটনা দেখা যাচ্ছে। এতে চালক, কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ ভোক্তারা ভোগান্তিতে পড়েছেন।
কুমিল্লা শহরের কয়েকটি ফিলিং স্টেশনে ঘুরে দেখা যায় পেট্রল ও অকটেনের স্বল্পতা দেখা দিয়েছে; অনেক যানবাহন দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়াতে বাধ্য হচ্ছে, কেউ কেউ তেল না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। চকবাজার এলাকার নুরুল হুদা পাম্প ম্যানেজার ইকবাল হোসেন অভিযোগ করেন, নির্ধারিত কোটার বাইরে নিয়ে যাওয়ার অনুপ্রবণতা বেড়েছে—মোটরসাইকেলে ২ লিটার দেওয়ার কথা থাকলেও কিছু ক্রেতা বেশি নিয়ে আবার লাইনে ফিরে আসে। অন্যদিকে চালকরা বলছেন, কিছু পাম্পে সিন্ডিকেট গঠন করে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, ফলে সাধারণ ভোক্তার কষ্ট বাড়ছে।
হরিরামপুর (মানিকগঞ্জ) কৃষিপ্রধান উপজেলার কৃষকেরা সেচ কাজে ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। চরাঞ্চলে নৌকা চলাচলের জন্য ইঞ্জিন-ডিজেল দরকার হওয়ায় তেলের সংকট পড়লে কৃষিকাজ ও পারাপারে খরচ বাড়ছে। স্থানীয় বাজারে দেখা গেছে, কেউ অতিরিক্ত দাম দিলে তেল মিলছে; খুচরা বিক্রেতারা বলেন পাইকারি স্তর থেকে মজুদ ও দামের কারণ দেখিয়ে চাপ আসছে। অনেক গ্রাহকে খালি গ্যালন হাতে এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরতে দেখা গেছে। মেসার্স ওয়াজিহা ট্রেডার্সের মালিক মো. সুজন মিয়া জানান, তাদের দোকানে তেল আসেনি, সরবরাহ থেমে গেছে।
মেহেরপুরেও তেল মজুদের চেষ্টা ও ভোগান্তি দেখা যাচ্ছে; বেশির ভাগ পাম্প বন্ধ রাখা হয়েছে বলেও খবর আছে। চাষিরা বলছেন, বোরো সেচের সময় তেলে অস্থিরতা কৃষিজীবনকে ব্যাহত করছে—কেউ কেউ কয়েকদিন ধরে ডিজেল পায়নি। ট্রাকচালকরাও বড় দূরত্বে যাতায়াতের জন্য পর্যাপ্ত তেল না পেয়ে ভোগান্তির মুখে পড়েছেন। জেলা তেল পাম্প মালিক সমিতির সভাপতি নুর হোসেন আঙ্গুর বলেন, তেলের দাম বাড়ার কোনো আনুষ্ঠানিক সংবাদ তাদের কাছে নেই; মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের খবর নিয়ে আতঙ্কে ক্রেতারা পাম্পে ভিড় করছে।
জীবননগর (চুয়াডাঙ্গা) ও আশেপাশের পাম্পগুলোতেও লম্বা লাইন ও কনটেইনারে তেল তোলার দৃশ্য লক্ষ্য করা গেছে। মেসার্স অংগন ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার ফরহাদ হোসেন জানান, বিক্রি অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই ট্যাংকি ছাড়াও আলাদা পাত্রে তেল নিয়ে যাচ্ছে; তারা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের নির্দেশনা মেনে তেল বিক্রি করার চেষ্টা করছেন।
প্রশাসন-নিগমের প্রতিক্রিয়া: মানিকগঞ্জ জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আসাদুজ্জামান রুমেল বলছেন, কৃত্রিম মজুদের বিষয়ে নজর রাখা হচ্ছে; যারা অবৈধভাবে তেল মজুদ করবে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মেহেরপুর জেলা প্রশাসক ড. সৈয়দ এনামুল কবির বলেছেন, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তবে আপাতত বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযোগ পাওয়া যায়নি; প্রশাসন বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।
সংক্ষিপ্তভাবে বলা যায়, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির উদ্বেগ ও ভোগান্তি সৃষ্টি করা ব্যক্তি বা গ্রুপের দৌলতে লোকাল পর্যায়ে তেলের সরবরাহ ও মূল্য অস্থির হচ্ছে। কৃষি মৌসুম, যানবাহন চলাচল ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাফেরার উপর এ পরিস্থিতি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। প্রশাসন, তেল সরবরাহকারী ও বাজার অংশীদারদের দ্রুত সমন্বয় করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং কৃত্রিম মজুদ রোধ করার মাধ্যমে তাত্ক্ষণিক রিলিফ নিশ্চিত করতে হবে।






