মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছে গেল—ইরানের রাজধানী তেহরানসহ অন্তত পাঁচটি শহরে একযোগে ভয়াবহ বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনী। বুধবার ভোররাত থেকে শুরু হওয়া এই অভিযান চলাকালে তেহরান, আহভাজ, শিরাজ, ইসফাহান, কারাজ ও কেরমানশাহে কৌশলগত ও বেসামরিক বিভিন্ন স্থাপনাই লক্ষ্য ছিল। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোরের এই আকাশপথে আক্রমণ এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় পরিচালিত এসব হামলায় শুধুমাত্র সামরিক লক্ষ্যবস্তু নয় — গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোও সুপরিকল্পিতভাবে টার্গেট করা হয়েছে। তেহরানে অবস্থিত একটি অত্যাধুনিক ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহৃত জীবনরক্ষাকারী ওষুধ উৎপাদনকারী কারখানাকে লক্ষ্য করে বোমা বর্ষণ করা হয়, যা আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এছাড়া ইসফাহান ও পূর্ব ইরানের বোরোজেনে বড় বড় স্টিল কারখানা, বন্দর আব্বাসের সমুদ্রবন্দর, বুশেহরের একটি আবহাওয়া গবেষণা কেন্দ্র এবং পশ্চিম ইরানের বিভিন্ন আবাসিক ভবনও হামলার আওতায় পড়েছে। এসব আঘাত বেসামরিক সম্পদের ওপর ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি করেছে, যার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ইরান সরকার।
ইরানি কর্তৃপক্ষ এই হামলাকে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার চরম লঙ্ঘন ও ‘রেড লাইন’ অতিক্রম হিসেবে বিবেচনা করছে। তেহরান ইতোমধ্যেই প্রতিরোধ ও পাল্টা আঘাতের প্রস্তুতি ত্বরান্বিত করার ঘোষণা দিয়েছে। নীতিনির্ধারকরা বলছেন, বেসামরিক নাগরিক এবং জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানকে উদ্দেশ্য করে করা এই আক্রমণ আন্তর্জাতিক যুদ্ধআইন লঙ্ঘন করে এবং এর প্রতিটি ধাপের প্রতিশোধ নিশ্চিত করা হবে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি কঠোর বার্তা দিয়ে সতর্ক করেছেন যে, জীবনরক্ষাকারী ওষুধ কারখানায় হামলা আন্তর্জাতিক দৃষ্টিতে অভিযুক্তদের আসল চেহারা উন্মোচন করেছে। তিনি বলেন, হামলাকারীরা হয়তোই ভুল বোঝাপড়া করেছেন যদি তারা মনে করেন ইরানিরা সহজে দমে যাবে। আরাগচি আরও বলেছেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী শক্তিশালী এবং এই বর্বর আগ্রাস্যের জন্য দোষীদের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ভোগ করতে হবে।
বর্তমান এই নজিরবিহীন উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যকে একটি অনিয়ন্ত্রিত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে বলে সতর্ক করছেন সামরিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, সংঘাত আঞ্চলিক সীমাবদ্ধ থাকেই না—এর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতিতেও গুরুতর আঘাত হেনতে পারে। তেহরানের যে কোনও কঠোর প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের সম্ভাবনা এখন প্রকট রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে উদ্বিগ্ন।
সামগ্রিকভাবে এ মুহূর্তে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও জীবিকা সংকটে পড়েছে; হাসপাতালে আগত রোগীদের চিকিৎসা ও জরুরি পরিষেবাগুলোও ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক কূটনীতিগত চাপ ও তড়িঘড়ি কূটনৈতিক উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট আরও জটিল আকার নেবে—এমনটাই আশঙ্কা পৃথক পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকদের।






