মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝেও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাংলাদেশের ছয়টি বাণিজ্যিক জাহাজ পার হওয়ার আনুষ্ঠানিক অনুমতি দিয়েছে ইরান। এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহীমি জাহানাবাদী; তিনি এটি জানিয়েছেন ইরান দূতাবাসে বুধবার (১ এপ্রিল) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে।
রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধের প্রেক্ষিতে তেহরান এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচলের জন্য ইরান সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। প্রথম দিকে জাহাজগুলোর কারিগরি সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকায় সেগুলো শনাক্ত করতে সমস্যা হয়েছিল। কিন্তু গত সপ্তাহে বাংলাদেশ সরকারের তরফ থেকে প্রয়োজনীয় সব তথ্য পেলে এখন শনাক্তকরণ ও চলাচলের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
জাহানাবাদী আরও জানান যে, বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দামের প্রভাবে পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন করা মানুষের ছবি ও প্রতিবেদন তিনি তেহরানে পাঠিয়েছেন। বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের মানুষের কষ্ট লাঘবে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরান সবসময় পাশে থাকবে—এমন আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
মানবিক সহায়তার একটি উদাহরণ হিসেবেও রাষ্ট্রদূত জানাচ্ছেন, সম্প্রতি ইরানে আটকে থাকা প্রায় ১৮০ জন বাংলাদেশিকে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে দিয়েছে ইরান সরকার। তাদের মধ্যে অনেকের বৈধ পাসপোর্ট বা ভিসা ছিল না এবং অননুমোদিতভাবে তারা সেখানে ছিলেন; তবু গ্রেপ্তার বা হয়রানি না করে নামমাত্র জরিমানা আর বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে তাদের প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করা হয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ সহায়তার জন্য ইরানকে ধন্যবাদ জানিয়ে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন, তবে চলমান যুদ্ধ নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক এক বিবৃতিকে তেহরান কিছুটা মর্মাহতভাবে গ্রহণ করেছে বলে তিনি যোগ করেছেন।
হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরান কঠোর অবস্থান নেবে—সংবাদ সম্মেলনে সেই বার্তাও দেন তিনি। জলিল রহীমি বলেন, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির পর এখানে জাহাজ চলাচলের নিয়মে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হবে; ‘ইনোসেন্ট প্যাসেজ’ বা নির্দোষ চলাচলের নিয়মকে ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ইরানের অনুমতি ছাড়াই কোনো জাহাজ এই পথ ব্যবহার করতে পারবেনা—এ বিষয়ে পার্লামেন্ট ও সরকার ইতোমধ্যেই প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে। তিনি ইরান এলাকায় নিজের সার্বভৌমত্বর বিষয়টি নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর বলেও মন্তব্য করেন।
সংঘাতের প্রসঙ্গ তুলে রাষ্ট্রদূত বলেন, এই যুদ্ধে তারা কেবল ইরানের বিরুদ্ধে লড়াই দেখেন না; তিনি এটিকে ইসলামী সভ্যতা ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে একটি গভীর ষড়যন্ত্র হিসেবে অভিহিত করেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ১৫ দফার শান্তি পরিকল্পনাকে তিনি ওয়াশিংটনের ‘একপাক্ষিক চাওয়াপাওয়ার তালিকা’ বলে আখ্যা দেন এবং বলেন, এ বিষয়ে ইরান ও আমেরিকার সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। তিনি বলেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র তখনই শান্তির কথা বলে যখন তারা অস্ত্রের সংকটে পড়ে; ইরান যুদ্ধ চান না, তবে এমন এক শান্তি চান যা ইরানের অধিকার রক্ষা করবে ও স্থায়ী স্থিতিশীলতা নিয়ে আসবে।
সংবাদ সম্মেলনের শেষভাগে রাষ্ট্রদূত আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, এই যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি বাংলাদেশের জনগণ ইতিবাচকভাবে বোধ করবে এবং দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকবে। ইরান পশ্চিম এশিয়ার জাহাজ চলাচল ও সুরক্ষায় গুরুত্বসহকারে ভূমিকা রাখতে আগ্রহী—এটাই ছিল তার প্রধান বার্তা।






