আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ‘সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ’কে এখন আইনে পরিণত করার উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি সরকার। এই অধ্যাদেশটি সংশোধন করে নতুন শাস্তির নিয়মও যোগ করা হচ্ছে। সরকার গঠনের পর বিএনপি প্রথমে বলেছিল, নির্বাহী আদেশে কোন রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা উচিত নয়; জনগণই এতে সিদ্ধান্ত নেবে। তবে, সরকারের হাতে ক্ষমতা থাকায় তারা এখন এই অধ্যাদেশটিকে আইনগত রূপ দিতে ও শাস্তির বিধান সংযোজনের কাজ শুরু করেছে। এর ফলে বর্তমান সময়ের জন্য আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি থাকবে এবং, যদি এই বিধান কার্যকর হয়, তাহলে দলটি তাদের রাজনীতি কার্যক্রম চালানোর জন্য আরও কঠিন বাধার মুখোমুখি হবে।
আন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ এখন সংসদে উত্থাপনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এর মধ্যে গঠিত ১৪ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি এই অধ্যাদেশগুলো যাচাই-বাছাই করছে। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যদি কোনও অধ্যাদেশ সংসদে পাস না হয়, তাহলে ৩০ দিনের মধ্যে তা কার্যকরিতা হারাবে।
গত বৃহস্পতিবার এই কমিটি ৯৮টি অধ্যাদেশ পরিবর্তন না করে কেবল আইনে রূপান্তর করার জন্য সংসদে বিল উত্থাপনের সুপারিশ করে। সেই সাথে ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধন করে বিল আনার প্রস্তাব দেয়া হয়। তবে, আরও ১৬টি অধ্যাদেশ এই সময়ে পরিবর্তন না করে রাখার সুপারিশ করা হয়, এবং চারটি অধ্যাদেশ বাতিলের জন্য হেফাজতের পক্ষ থেকে সুপারিশ এসেছে।
উল্লেখ্য, এই ১৫টি অধ্যাদেশের মধ্যে অন্যতম হলো ২০২৫ সালের ১১ মে জারি করা ‘সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ’। এই অধ্যাদেশটি ২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ১৮ ও ২০ ধারা সংশোধন করে তৈরি, যার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। এছাড়া, একই আইনে ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে ছাত্রলীগের কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করা হয়।
পুলিশ ও সরকারের নীতিনির্ধারকদের মতে, গত বছরের ৯ মে রাতে ছাত্রলীগ ও অন্যান্য বিরোধী দলের নেতারা যমুনা নদীর কাছে অবস্থান করে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের দাবিতে আন্দোলন চালায়। এরপর বিভিন্ন দল – জামায়াতে ইসলামি, গণঅধিকার পরিষদ, ইসলামী আন্দোলন, এবি পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ অনেকে এই আন্দোলনে যোগ দেয়। ১১ মে রাতে সরকারি উপদেষ্টা পরিষদ জরুরি বৈঠক করে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ধারা সংশোধন করে নতুন সংবিধান তৈরি করে, যেখানে বলা হয় যে, কোনও সংগঠন বা ব্যক্তি সন্ত্রাসী কার্যক্রম করলে সরকার নির্বাহী আদেশে তাদের কার্যক্রমই নিষিদ্ধ করতে পারবে।
এছাড়া, এই সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকবে। যদিও, এই নিষেধাজ্ঞার কারণে আওয়ামী লীগ মিছিল, সভা, সমাবেশ, দলীয় কার্যালয় বন্ধ, ব্যাংক হিসাব জব্দ, পোস্টার-ব্যানার প্রচার, গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার বা সংবাদ সম্মেলন করতে পারবে না। আইনে বলা হলো, নিষিদ্ধ সংগঠন এসব কার্যক্রম চালালে ৪ থেকে ১৪ বছর কারাদণ্ড হতে পারে। তবে, অধ্যাদেশে স্পষ্ট বলা হয়নি, এই কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন যদি সভা বা সমাবেশ করে, তাহলে কি শাস্তি হবে। ফলে, এতদিন কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকলেও দমনমূলক শাস্তির বিধান ছিল না।
অধ্যাদেশের বিষয়গুলোর ওপর মন্ত্রণালয় বিশেষ কমিটির মতামত নিয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের বিরুদ্ধে কোনও শাস্তির বিধান এখনো নেই, তবে ভবিষ্যতে সংযোজনের প্রয়োজন হতে পারে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর দৃষ্টিতে, কী ধরনের শাস্তি যুক্ত হবে তা এখনও নির্দিষ্ট হয়নি। তবে, সরকারি সূত্র বলছে, আইন অনুযায়ী যেসব শাস্তি ধারায় রয়েছে, সেগুলোর মাধ্যমে নিষিদ্ধ কার্যক্রমের শাস্তি নিশ্চিত হবে।
অভিযুক্ত এসব বিষয়ের ব্যাপারে আওয়ামী লীগ দলীয়ভাবে কোনও মন্তব্য করতে চায়নি। সভাপতিমণ্ডলীর একজন সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আবদুর রহমান বলেন, সরকার যা করবে, জনগণই সিদ্ধান্ত নেবে। তিনি আরো যোগ করেন, আওয়ামী লীগের জন্য এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা নতুন নয়; অতীতে তারা এই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে।
এদিকে, এই অধ্যাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আওয়ামী লীগ যদি আদালত থেকে মামলা করে, সে বিষয়ে জানতে চাইলে, তিনি বলেন, যেখানে আইনি পদক্ষেপ প্রয়োজন, সেখানে তারা নেবে, যেখানে প্রতিবাদ করতে হবে, সেও তারা করবে। তবে এখনো এই বিষয়গুলো নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে দলটি।






