ইরানとの চলমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিমানের ক্ষয়ক্ষতি ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে — তবে প্রকৃত পরিমাণ নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে ভিন্নমত রয়েছে। রয়টার্স, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, দ্য গার্ডিয়ান ও বিজনেস ইনসাইডারসহ বিভিন্ন সূত্রের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সংঘাত শুরুর পর থেকে নিশ্চিতভাবে ধ্বংস বা ভূপাতিত হওয়া মার্কিন এয়ারক্রাফটের সংখ্যা অন্তত ১৬টির বেশি হতে পারে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত বিমানগুলোসহ মোট হার ২০–এর আশপাশে বা তারও বেশি দাঁড়াতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
কিছু নির্দিষ্ট ঘটনার বিবরণও গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, একটি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল যুদ্ধবিমান ইরানের ভেতরে ভূপাতিত হওয়া প্রথমবার নিশ্চিত করা হয়েছে; এ ঘটনায় দুই ক্রু সদস্যের একজনকে উদ্ধার করা হলেও অন্যজন নিখোঁজ রয়েছেন। একই সময় আরেকটি এ-১০ থান্ডারবোল্ট-২ আক্রমণ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার খবর আসে—উদ্ধার অভিযান চালাতে গিয়ে একটি মার্কিন হেলিকপ্টারও হামলার শিকার হয়েছে বলে জানানো হয়েছে, যা সংঘাত জটিলতার মাত্রা বাড়িয়েছে।
ড্রোন খাতে সবচেয়ে বড় ক্ষতির উল্লেখ করা হয়েছে। এনডিটিভি এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষা সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নজরদারি ও নির্ভুল হামলার কাজে ব্যবহৃত এমকিউ-৯ রিপার ড্রোনের অন্তত দশটির বেশি ভূপাতিত হয়েছে; কিছু বিশ্লেষক এই সংখ্যাকে আরও বেশি হিসেবে দেখাচ্ছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, এমকিউ-৯-এর ধীরগতি ও নির্দিষ্ট ফ্লাইট প্যাটার্নের কারণে এগুলো ইরানের সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কাছে তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
কিছু ঘটনা ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’ বা মিত্রবাহিনীর ভুল আক্রমণের কারণে হয়েছে বলে জানা গেছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে কুয়েতে তিনটি এফ-১৫ মিত্রবাহিনীর ভুলে ধ্বংস হয়—তবে সেই ঘটনায় ক্রু সদস্যরা সুরক্ষিতভাবে বেরিয়ে এসেছিলেন। এছাড়া এক কেসি-১৩৫ স্ট্র্যাটোট্যাঙ্কার রিফুয়েলিং বিমান একটি দুর্ঘটনায় ধ্বংস হয়ে ছয়জন মার্কিন বিমানকর্মীর মৃত্যু হয়েছে; সরকারি ব্যাখ্যা অনুযায়ী তা শত্রু হামলা নয়, অপারেশনের সময় ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার ফল। আর এক রিপোর্টে বলা হয়েছে সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান এয়ার বেসে ইরানের হামলায় একটি ই-৩ সেন্ট্রি মাটিতে ধ্বংস হয়ে অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন এবং একটি ট্যাংকার বিমানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অর্থনৈতিক ক্ষতিও উল্লেখযোগ্য: এমকিউ-৯ রিপারের মূল্য প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলার, একটি এফ-১৫ই যুদ্ধবিমানের মূল্য প্রায় ৮০–১০০ মিলিয়ন ডলার এবং কেসি-১৩৫ ধরনের সহায়ক প্ল্যাটফর্ম উচ্চমূল্যের কৌশলগত সম্পদ। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সংঘাতের প্রথম পর্যায়েই ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন ডলারের ওপরে গিয়েছে।
ইরানের আত্মবিশ্বাসী দাবি এবং বিশ্লেষকদের ব্যাখ্যা
ইরান নিজেও দাবি করেছে যে তারা আধুনিক কৌশল ও নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করছে। ইরানের জয়েন্ট এয়ার ডিফেন্সের এক কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলীরেজা ইলহামি বলেছেন, তাদের বাহিনী নতুন পদ্ধতি ও উন্নত সরঞ্জাম ব্যবহার করে সাফল্য অর্জন করেছে, যদিও তিনি বিস্তারিত প্রযুক্তি বা কৌশল প্রকাশ করেননি।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সমন্বিত প্রতিরক্ষা কৌশল — স্থলভিত্তিক সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল (এসএএম), মোবাইল এয়ার ডিফেন্স ইউনিট এবং ইলেকট্রনিক জ্যামিং—এর সমন্বিত ব্যবহার ড্রোন ও নিম্ন-উচ্চতার বিমানগুলিকে বড় ঝুঁকির মধ্যে রাখছে। বিশেষত ধীরগতির এমকিউ-৯ের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো নির্দিষ্ট নিদর্শন অনুসরণ করলে সহজেই টার্গেট হয়ে উঠছে।
কৌশলগত প্রভাব
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ক্ষয়ক্ষতি শুধু আর্থিক নয়, কৌশলগত ভাবেও গুরুতর। ড্রোনের বড় ক্ষতি মার্কিন নজরদারি, গোয়েন্দা ও লক্ষ্যনির্ণয়ের সক্ষমতাকে আহত করতে পারে; আবার যুদ্ধবিমান হারানো আকাশে আধিপত্য বজায় রাখার সক্ষমতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে। সহায়ক প্ল্যাটফর্ম যেমন কেজি-১৩৫ হারালে দীর্ঘ সময়ের অপারেশন পরিচালনার সক্ষমতা দুর্বল হয়।
সংঘাতের সামনের দিনগুলিতে কি হবে?
রিপোর্টগুলোতে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত সংখ্যা ও কারণ সম্পর্কে বৈচিত্র্য থাকায় সঠিক চিত্র পেতে সময় লাগবে। তবে স্পষ্ট যে, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রকে এখন নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে—উচ্চতর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভাঙার উপায়, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ মোকাবেলা ও অপারেশনাল সমন্বয় আরও জোরালো করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
সমাপ্তি
মোটmil, আন্তর্জাতিক মিডিয়া ও বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনী উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল এবং পরিমাণ-সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ এখনও অসম্পূর্ণ। সংঘাত চলাকালীন এই হার কেবল আর্থিক ক্ষতি নয়, সামরিক কৌশল ও আকাশ নিয়ন্ত্রণের ধারণাকেও কঠোরভাবে পরীক্ষা করছে।






