জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের মামলায় বিচারকরা গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেছে পুলিশের সাবেক সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন ও সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়কে। এছাড়া, মামলার আরও তিনজন অভিযুক্তকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তারা হলেন, সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার (কোতোয়ালি জোন) আরিফুজ্জামান বা জীবন, তাজহাট থানার সাবেক অফিসার ইনচার্জ রবিউল ইসলাম বা নয়ন, এবং বেরোবির সাবেক ক্যাম্প ইনচার্জ বিভূতি ভূষণ রায় বা মাধব। এই রায় বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে ট্রাইব্যুনাল-২ ঘোষণা করে। বিচার চলাকালীন সময়ে কয়েকজন আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে তোলা হয়। তাদের মধ্যে পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কর্মকর্তা, শিক্ষক ও ছাত্রদের অন্তর্ভুক্ত। প্রমাণ ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত এই সিদ্ধান্ত নেয়। শহীদ আবু সাঈদের পরিবারের সদস্যরা এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, এ রায় শাস্তির মাত্রা আরও বেশি হওয়া উচিত ছিল। অতিরিক্ত আইনজীবীরা মনে করেন, কিছু আসামির বিরুদ্ধে গুলির বাস্তব প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মামলায় মোট ৩০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়, এর মধ্যে সাতজনকে ১০ বছরের কারাদণ্ড ও অন্য ছয়জনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এই মামলার বিচারে সরাসরি সাক্ষ্য, ঘটনার ভিডিও ফুটেজ, সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের লাইভ বিবরণসহ যাবতীয় প্রমাণ বিবেচনা করা হয়। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্ক মোড়ে পুলিশ গুলিতে নিহত হন ইংরেজি বিভাগের ছাত্র ও আন্দোলনের অন্যতম নেতা আবু সাঈদ। তিনি দুই হাত প্রসারিত করে বুক পেতে দিয়েছিলেন পুলিশকে, যা দেশের তরুণ প্রজন্মের মনকে গলিয়ে দিয়েছিল। তার এই আত্মত্যাগ ও গুলির প্রমাণ এখনও সম্পূর্ণ স্বচ্ছ নয় বলে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা মত প্রকাশ করেছেন। এ প্রসঙ্গে, আবু সাঈদের পরিবার এই রায়ের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘‘আমাদের ছেলের হত্যার সাজা হয়নি। বড় বড় পুলিশের কর্মকর্তারা বেঁচে গেছেন। আমরা চাই কঠোর শাস্তি, যেন ন্যায়ের প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়।’’ অন্যদিকে, আবু সাঈদর মা মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘‘রায় হয়েছে, তবে কোনো লাভ হবে না যতক্ষণ না কার্যকর হয়।’’ উল্লেখ্য, এই মামলায় ৩০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগের শুনানি ও বিচার প্রক্রিয়া গত বছর শুরু হয়। এরপর, গত ২৭ জানুয়ারি এই মামলার রায় দিতে ছিল ট্রাইব্যুনাল। প্রাসঙ্গিক প্রমাণ ও সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে আদালত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই রায় ঘোষণা করেন। মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ওই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা, যেমন গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিরা ও ভিডিও ফুটেজে দৃশ্যমান ঘটনাকারীরা। এদিকে, এই আন্দোলনের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু পুলিশ কর্মকর্তা ও ছাত্রলীগের নেতাদের এখনো পলাতক অবস্থায় রাখা হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল উল্লেখ করেন, যেসব পুলিশ সদস্যদের সামনে শহীদ আবু সাঈদ বুক পেতে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তারা তখন অমানুষে পরিণত হয়েছিলেন। ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান জানান, ‘আবু সাঈদ সাহসিকতা প্রদর্শন করে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, কিন্তু যারা তার সামনে ছিলেন, হানাদার ভেবে তাঁর প্রতি অবিচার করেছিল।’ এই রায়ের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন আবু সাঈদ পরিবারের সদস্যরা। তারা বলেন, ‘আমরা চাই, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। পুরো বিচার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।’ এই মামলার মূল আসামি দু’জনের বিরুদ্ধে এখনও গ্রেপ্তারি পরোয়া নেই, যাদের মধ্যে অন্যতম একজন কর্নেল হোসেন। ট্রাইব্যুনাল নেতৃস্থানীয় এই রায় দেশজুড়ে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান আরও বেগবান করেছে।






