মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা রোধের লক্ষ্যে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে ঐতিহাসিক বৈঠকে বসেছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান। দুই দিনের এই উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় পাকিস্তান মধ্যস্থতা করছে এবং বৈঠক শুরু থেকেই কূটনৈতিক মহলে গভীর মনোযোগ সৃষ্টি করেছে।
বৈঠকটি ত্রিদেশীয় ফরম্যাটে শুরু হয় — পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা একই মিটিংরুমে বসে সরাসরি সংলাপ চালান, যা ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর এ ধরনের উচ্চস্তরের সরাসরি আলোচনার অন্যতম বিরল মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বৈঠককে ‘দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথে প্রথম ধাপ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
পটভূমি ও সময়কাল
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে একটি হামলার সূত্রে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত তীব্র আকার ধারন করলে পরিস্থিতি দ্রুত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতেও তার প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত ৮ এপ্রিল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র দুই সপ্তাহের জন্য যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। সেই আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতির ধারাবাহিকতায় ইসলামাবাদে এই আলোচনার আয়োজন করা হয়েছে।
উপস্থিতি ও প্রারম্ভিক বার্তা
ইসলামাবাদের ওই বৈঠকে মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে সফররত প্রতিনিধিরা, এবং তাদের সঙ্গে ছিলেন মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক দূত স্টিভ উইলকফ ও সাবেক উপদেষ্টা জারেড কুশনার। পাকিস্তানের পক্ষে অংশগ্রহণে ছিলেন উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন রেজা নকভি। ইরানি প্রতিনিধিদলও ইসলামাবাদে পৌঁছে, তাদের নেতৃত্ব দেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
আলোচনার অগ্রগতি
কাতারভিত্তিক আল–জাজিরা এবং অন্যান্য সূত্রগুলো বলেছে, আলোচনা ইতিবাচক পরিবেশে পরিচালিত হয়েছে। শুরুতে পরোক্ষ কূটনীতিক আদানপ্রদান হিসেবে পরিকল্পিত আলোচনাগুলো পরে সরাসরি কথোপকথনে রূপ নেয় — যা অনেক বিশ্লেষকের কাছে বড় অগ্রগতি হিসেবে ধরা হচ্ছে। পাকিস্তানী কর্মকর্তারা জানান, দুই পাশে গঠনমূলক মনোভাব দেখা গেছে এবং আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার প্রয়াস থাকবে।
মুখ্য ইস্যু ও অমীমাংসিত বাধা
আলোচনায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। লেবাননে যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু অগ্রগতি আলোচনা হয়েছে; কিছু সূত্র বলছে, ইসরায়েলের অভিযান লেবাননের দক্ষিণ সীমান্তে সীমাবদ্ধ রাখার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এবং বৈরুতের ওপর আক্রমণ বন্ধ রাখার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ইরানি পক্ষ দাবি করেছে, তাদের বিদেশে জব্দ থাকা সম্পদ রিলিজসহ কিছু পরিবর্তন ঘটছে।
তবুও অনেক জটিল ইস্যু আসামান্য রয়ে গেছে— নিরাপত্তা গ্যারান্টি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আঞ্চলিক শক্তি বণ্টন, ক্ষেপণাস্ত্র বিষয়ক উদ্বেগ এবং বিদেশে প্রভাবশালী প্রক্সি গোষ্ঠীর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি। ইরান সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না হলে স্থায়ী সমঝোতায় আগাবেনা বলে জানা গেছে, আর যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ইরানের প্রভাব সীমিতকরণে জোর দিচ্ছে। এই সব বিষয়ে মৌলিক মতবিরোধ রয়েছে এবং সেগুলো কেটে ওঠা সময়সাপেক্ষ হবে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও সতর্ক আশাবাদ
বৈঠককে অনেকেই আশাব্যঞ্জক সঙ্কেত হিসেবে দেখলেও কূটনৈতিক মহল সতর্কভাবে আশাবাদী; দুই দিনের এ প্রাথমিক রাউন্ড থেকে বড় কোনো চুক্তি আসার আশা সীমিত। এটি যদি ভবিষ্যৎ আলোচনার পথ তৈরি করে এবং উত্তেজনা কমায়, তাতে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতার জন্য তা ইতিবাচক হবে। পাকিস্তান বলেছে তারা বৈঠক সফল করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে, আর আমেরিকান পাশ থেকে সতর্ক সুরও শোনা গেছে যে আলোচনা ব্যর্থ হলে বিকল্প পদক্ষেপও বিবেচিত হতে পারে।
সমাপনী ধারণা
ইসলামাবাদে হওয়া এই সংলাপকে কূটনৈতিক ইতিকথায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা বলা হচ্ছে: প্রদর্শিত আস্থা ও সরাসরি কথাবার্তা ইতিবাচক হলেও শতবর্ষী অবিশ্বাস মুছে ফেলা সহজ নয়। তবে এখনো যে আলোচ্যসূচি ও স্টিকিং পয়েন্ট রয়েছে, সেগুলো মোকাবেলায় আরেক ধাপ প্রয়োজন। সর্বোপরি, এই আলোচনার ফল ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রতিষ্ঠায় নির্ধারক ভূমিকা রাখতে পারে—বশর্তে যে অংশগ্রহণকারী দেশগুলো বাস্তব ও স্থায়ী সঙ্গতিপূর্ণ সমাধান খোঁজার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে।






