ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বড় বাজারগুলোর নেতিবাচক প্রবণতার কারণে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পটি এখন কঠিন সময়ের মুখে পড়েছে। দেশের অর্থনৈতিক প্রাণবন্ত খাতের রপ্তানি পরিস্থিতিতে বনিবনা করতে পারছে না। নতুন বাজার হিসেবে অস্ট্রেলিয়া, চিলি, ভারত, জাপান, কোরিয়া, মেক্সিকো, নিউজিল্যান্ড, রাশিয়া, তুরস্কসহ অন্যান্য দেশে রপ্তানি কমে গেছে। তবে বিপরীতে, চীন, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মতো বাজারে রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশেষ করে ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোতে বাংলাদেশের রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে। বেলজিয়াম, ক্রোয়েশিয়া, চেক, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, হাঙ্গেরি, ইতালি, আয়ারল্যান্ড, লুক্সেমবার্গ, পর্তুগাল, রোমানিয়া, স্লোভাকিয়া ও সুইডেনের মতো দেশে রপ্তানির পরিমাণ কমেছে। তবে স্পেন, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড, লাটভিয়া, স্লোভেনিয়া সহ কিছু ছোট দেশে সামান্য বেড়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি একটু কমে গেছে, যা প্রতি শতাংশে ০.১০ এর মতো। কানাডা ও যুক্তরাজ্যে রপ্তানি সামান্য বেড়েছে কিন্তু তা পুরোপুরি বিশ্ববাজারের নেতিবাচক প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারেনি। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৫), বাংলাদেশের রপ্তানি মোট ১৯,৩৬৫ মিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২.৬৩ শতাংশ কম।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ক্রেতাদের ব্যয় সংকোচন এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী। এসব কারণে রপ্তানিকারকদের আয়, কর্মসংস্থান ও দেশের অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ছে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) এই সময় রপ্তানি হয়েছে ৯,৪৫৯ মিলিয়ন ডলার, যা মোট রপ্তানির অর্ধেকেরও বেশি। তবে, এই পরিমাণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪.১৪ শতাংশ কমে গেছে। জার্মানি, ফ্রান্স, ডেনমার্ক ও বেলজিয়ামের মতো বড় বাজারে বড় বড় পতন লক্ষ্যণীয়। জার্মানিতে ২৪৬৮ থেকে ২১৮৭ মিলিয়নে, ফ্রান্সে ১০৯১ থেকে ৯৭২ মিলিয়নে, ডেনমার্কে ৫৫৭ থেকে ৪৯৮ মিলিয়নে, এবং বেলজিয়ামে ২৯৫ থেকে ২৬৮ মিলিয়নে রপ্তানি কমেছে। অন্যদিকে, স্পেন, নেদারল্যান্ডস এবং পোল্যান্ডের মতো বাজারগুলোতে রপ্তানি বেড়েছে। স্পেনের রপ্তানি বেড়েছে ১৬৯৯ থেকে ১৮০৪ মিলিয়নে, নেদারল্যান্ডস ১০৫৭ থেকে ১০৭৭ মিলিয়নে, পোল্যান্ড ৭৯০ থেকে ৮৬৪ মিলিয়নে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বড় বড় বাজারের ক্রেতারা সংবেদনশীল এবং অর্ডার দিলে দাম কমানোর জন্য চাপ রয়েছে। উৎপাদন খরচ বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুযায়ী দাম পাওয়া যাচ্ছে না। তাই ইউরোপীয় বাজারে এখন খুবই সতর্ক থাকতে হবে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্পের প্রতিষ্ঠান বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, কয়েক মাস ধরে রপ্তানি নেতিবাচক ধারায় চলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কহার সারা বিশ্বে রপ্তানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। এর প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও, যেখানে রপ্তানি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।
তিনি আরও জানান, ভারত ও চীন দেশের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো মার্কিন শুল্কের কারণে এই বাজারে রপ্তানি করতে পারছে না। তারা এখন ইউরোপে অর্ডার গ্রহণের জন্য মূল্য কমিয়ে প্রতিযোগিতা করছে। ফলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা একই পণ্যে অর্ডার পেতে দুঃখে পড়ছেন। ভারত সরকার তাদের জন্য নানা রকম সহায়তা প্যাকেজও সম্প্রতি ঘোষণা করেছে, যার মূল্য ৭ হাজার কোটি রুপির বেশি।
হাতেম বলেন, অন্যদিকে, সরকারের আইএমএফ কর্মসূচি ও এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের ফলে রপ্তানি খাতে নগদ সহায়তা ও অন্যান্য সুবিধা সংকুচিত করা হয়েছে। যা ধরা পড়ছে না। এই সহায়তা শেষ হওয়ার পর, রপ্তানিকারকদের জন্য চলমান সমস্যাগুলি আরও বৃদ্ধি পাবে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, না হলে স্পিনিং মিল বন্ধ হয়ে যায় এবং বিভিন্ন গার্মেন্টস কারখানা বন্ধের পথে গিয়ে রপ্তানি sector সংকটে পড়বে।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, বিশ্ববাজারের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে সাময়িকভাবে রপ্তানি কমে গেছে। তবে অনূত উদ্যোগ, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং নতুন বাজারে প্রবেশের মাধ্যমে আবার পুনরুদ্ধার সম্ভব। বিশেষ করে ইউরোপ এবং মার্কিন বাজারে চাহিদা বাড়ানোর জন্য দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে।






