ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের আগমন এবং ভোটের প্রস্তুতির মাঝে দেশে অস্ত্র ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাত্রা দিন দিন বেড়ে চলেছে। চলমান পরিবেশে দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক চৌকস হামলা, গুলির ঘটনাসহ হত্যা ও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে, যা নির্বাচনী পরিস্থিতিকে আরও সংকটময় করে তুলছে। নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহেই অন্তত চারটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে গুলি চালানো ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে জীবনের ঝুঁকি বৃদ্ধি পেয়েছে। এর আগে জনসমাগমে হামলা, গুলিবর্ষণসহ নানা অপ্রকাশ্য অপরাধের ঘটনা ঘটেছে, যা স্পষ্ট করে যে, নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে পড়ছে।
ঢাকার অপরাধ জগতের বিরুদ্ধে এখনো বড় ধরনের অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। সরবরাহকারী ও সন্ত্রাসীদের কাছ থেকেও ইসলাকৃত অস্ত্রের চিত্র খুব একটা দেখা যায়নি। চলতি বছরে ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পরে জেলাতো সরকারি লুট করা অস্ত্রের মধ্যে এখনো ১৩৩৩টি উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। এ অবৈধ অস্ত্রের উপস্থিতি রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে হামলা ও অপ্রাপ্তিসম্পন্ন সন্ত্রাসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
তবে সরাসরি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বা হামলার ঘটনা খুব বেশি না হলেও, গোপনীয়তা ও মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ লোপ পাচ্ছে। গত ৩১ ডিসেম্বর রাতে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় মোটরসাইকেলে থাকা ব্যক্তির ওপর গাড়ির ধাক্কা-মারক-প্রতেকে গুলি চালিয়ে আইনজীবী নাঈম কিবরিয়াকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। একইদিন, শরীয়তপুরের ডামুড্যায় খোকন চন্দ্র দাসকে কুপিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। এর আগে ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে দীপু চন্দ্র দাস নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। সর্বশেষ, রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকাগুলোর মধ্যে ফার্মগেট ও কারওয়ান বাজারের অদূরে তেজতুরী বাজারে গুলিবিদ্ধ হত্যাকাণ্ড ঘটে, যেখানে স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতা মারা যান।
গাজীপুরে বৃহস্পতিবার দুপুরে এক এনসিপি কর্মীকে লক্ষ্য করে দুর্বৃত্তরা গুলি চালিয়ে তার মোটরসাইকেল ছুরি দিয়ে পালিয়ে যায়। ঐ ব্যক্তি অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান। এছাড়া, একই দিন শরীয়তপুরের জাজিরায় একটি বিস্ফোরণে দুই যুবক নিহত হন, যা পুলিশের ধারণা ককটেল তৈরির সময় ঘটে। এ ধরনের ককটেল ও বিস্ফোরকদের ব্যবহার ভোটে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
২০ ডিসেম্বর ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের একটি বাড়িতে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে বাড়ির দুটি কক্ষ ধ্বংস ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। পুলিশ স্থানীয় তারিখে ককটেল, রাসায়নিক পদার্থ ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে এবং কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করেছে। এর আগে ১৮ ডিসেম্বর লক্ষ্মীপুরে বিএনপি নেতা ও তার পরিবারের ওপর দফায় দফায় হামলা ও আগুনের ঘটনা ঘটে। এক শিশুসহ সাতজন দগ্ধ হন।
নির্বাচনী পরিস্থিতির আরও আগাম ছদ্মবেশী হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। চট্টগ্রামের রাউজানে এক যুবদল নেতাকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সরকারের বিরোধী দলের নেতাদের লক্ষ্য করে গুলির ঘটনায় আতঙ্ক আরও বাড়ছে। এসব ঘটনায় নির্বাচনী পরিবেশে ভয় ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তার আভাস তৈরি করতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বিপদের মাত্রা বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য সংসদ সদস্য প্রার্থী শহীদ শরিফ ওসমান হাদির ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনায় সর্বত্র আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। ১২ ডিসেম্বর পুরানা পল্টনে নামাজের সময় হঠাৎ তাকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। এরপর থেকে বিভিন্ন স্থানে অন্তত আটটি গুলির ঘটনা ঘটেছে।
অসাধারণ পরিস্থিতি মোকাবেলায় ১৩ ডিসেম্বর থেকে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২’ শুরু হয়। এই অভিযানে ১৫ হাজার ৯৩৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও, পেশাদার ও বড় সন্ত্রাসীদের ধরা পড়ার হার খুবই কম। গুলির ঘটনাগুলোর মধ্যে অস্ত্র উদ্ধার সম্ভব হয়েছে মাত্র ২৩৬টি।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যে, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারাও নিরাপত্তা উদ্বেগে ভুগছেন। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় ইসি পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিতের জন্য। পরিস্থিতির মোকাবিলায় বিশেষ নজরদারির পাশাপাশি প্রার্থীদের নিরাপত্তা ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে। পুলিশ মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম জানান, নিরাপত্তার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অচেনা অপরাধীদের বিরুদ্ধে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ চালানো হচ্ছে। তিনি আশ্বাস দেন, নির্বাচনকে সম্পূর্ণ নিরাপত্তার আওতায় রাখতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।






