দেশে নিপাহ ভাইরাসের সঙ্কট আবারও উদ্বেগের কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। আক্রান্তদের মৃত্যুহার তুলনামূলক অনেক বেশি এবং গত দুই বছরে আক্রান্ত প্রত্যেকেই মারা গেছেন। বিশেষ করে অ-মৌসুমি সংক্রমণের ঘটনা ঘটছে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। গত বছর আগস্ট মাসেও নিপাহ শনাক্ত হয় এবং একজনের মৃত্যু হয়েছিল, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের গভীর চিন্তায় ফেলেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণের ক্ষমতা এবং মৃত্যুহার কোভিডের তুলনায় অনেক বেশি। অতএব, এই পরিস্থিতিতে খেজুরের রসের অনিয়ন্ত্রিত বিক্রি ও ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা না দিলে বড় ধরনের মহামারি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এর তথ্যমতে, ২০০১ সাল থেকে এ পর্যন্ত দেশে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে ৩৪৭ জন। এর মধ্যে ২৪৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। শুধু ২০২৪ সালে চারজনের এবং ২০২৫ সালে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মানে, গত দুই বছরে আক্রান্ত প্রত্যেকজনেরই মৃত্যু ঘটেছে।
বিশ্বজুড়ে নিপাহ ভাইরাসের মৃত্যুহার গড়ে ৭২ শতাংশ হলেও, বাংলাদেশে এর ভয়াবহতা আরও বেশি বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞরা। আইইডিসিআর এর বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শারমিন সুলতানা জানান, সাধারণত ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল এ ভাইরাসের মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু ২০২৫ সালের আগস্টেও রোগী শনাক্ত হওয়ায় নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, কেবল খেজুরের কাঁচা রস নয়, অন্যান্য উৎস থেকেও সংক্রমণ ঘটতে পারে।
একই সঙ্গে, গত বছর প্রথমবারের মতো ভোলা জেলায় নিপাহ ভাইরাস শনাক্ত হয়, যেখানে আগে এই ভাইরাসের অস্তিত্ব দেখা যায়নি। গবেষকরা বলছেন, এখন বাদুড়ের অর্ধ-খাওয়া ফল যেমন কালোজাম, খেজুর ও আম থেকেও সরাসরি সংক্রমণের প্রমাণ মিলেছে। নিপাহ ভাইরাসে মারা যাওয়া চারজনের মধ্যে নওগাঁর আট বছরের শিশুর ঘটনা ছিল দেশের প্রথম অমৌসুমি সংক্রমণ, যা শীতকাল ছাড়া আগস্ট মাসে শনাক্ত হয়। এই শিশুর সংক্রমণের উৎস হিসেবে বাদুড়ের অর্ধ-খাওয়া ফল পাওয়া গেছে।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র (আইইডিসিআর) বলেছে, নিপাহ একটি জুনোটিক রোগ, অর্থাৎ বন্যপ্রাণী বা অন্যান্য প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ায়। এজন্য তারা ‘ওয়ান হেলথ’ অন্তর্ভুক্ত মডেলে কাজ করছে, যেখানে মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণী, পরিবেশ ও সমাজের আচরণ সব কিছুই গুরুত্বপূর্ণ।
আইইডিসিআর এর সংক্রামক রোগ বিভাগের সহকারী বিজ্ঞানী ও নিপাহ জরিপের সমন্বয়কারি ডা. সৈয়দ মঈনুদ্দিন সাত্তার জানান, মাঠে দেখা গেছে রস সংগ্রহকারীরা নিরাপদ সংগ্রহের পদ্ধতি মানছেন না। অনেকসময় খোলা পাত্রে রস পরিবহন করা হয়, যেখানে ভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে। মানুষ ধারণা করে ‘ফুটিয়ে খেললেই সব ঠিক হবে’, কিন্তু রসের বাইরেও ফল বা পরিবেশ থেকে সংক্রমণের সম্ভবনা দেখছেন তারা। এখন পরিস্থিতি বোঝা যাচ্ছে, রসের মৌসুম ছাড়া আগস্টে রোগীর সংখ্যা দেখা যাচ্ছে, যা অপ্রত্যাশিত। এর ফলে সচেতনতা ধীরে ধীরে বাড়লেও, ভাইরাসের সংক্রমণ দ্রুত বিস্তার করছে। সতর্কতা আর নিয়মের প্রতি অবচেতন না হয়, এই জন্য অভ্যাসে পরিণত করতে হবে।
অপরদিকে, আইইডিসিআর এর পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরিন বলেন, ২০০১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত মোট ৩৪৭ জন নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২৪৯ জন মারা গেছেন। এটা ভাইরাসের বিধ্বংসী ক্ষমতার সরাসরি প্রমাণ। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন, কারণ সংক্রমণের পথ এখন বেশ পরিবর্তিত হচ্ছে। মা থেকে শিশু পর্যন্ত আক্রান্ত হওয়ায় নতুন দুশ্চিন্তা সৃষ্টি হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ভাইরাস বুকের দুধ বা কাছাকাছি পরিচর্যা থেকেও ছড়াতে পারে।
ডা. তাহমিনা অনলাইনে কাঁচা রস বিক্রির প্রসঙ্গ তুলে বলেন, এখন অনেকেই রস অনলাইনে কিনছেন এবং কম তাপমাত্রায় তার পরিবহন হচ্ছে, যাতে স্বাদ ও গুণমান জব্দ না হয়। কিন্তু এই কম তাপমাত্রা ভাইরাসকে জীবিত রাখার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করছে, যা ঢাকা ও শহরের অন্যান্য এলাকায় সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। ফলে, রসের বাজারে এখনই সচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন, যাতে এই ভাইরাসের বিস্তার ঠেকানো যায়।





