সংস্কারের নামে পুরোনো আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা রাষ্ট্রের মৌলিক উন্নয়নের পরিকল্পনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে অভিযোগ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের পর যা.expected প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার পরিবর্তে অতি সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা বেশ কয়েকটি অধ্যাদেশে সেই প্রত্যাশার ছায়া পড়েছে বলে মনে করে সংস্থাটি।
গতকাল সোমবার ঢাকায় ধনমন্ডির টিআইবি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এ সব কথানিয়েছেন। তিনি জানান, শতাধিক অধ্যাদেশ জারি হলেও এর অনেকগুলোতে আন্তর্জাতিক মান ও সাংবিধানিক ধারা উপেক্ষিত হয়েছে। বিশেষ করে দেশের দুর্নীতির দমন, বিচার ব্যবস্থা, পুলিশ ও মানবাধিকার বিষয়ক প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা ও স্বাধীনতা খুবই সীমিত রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
ড. ইফতেখার বলেন, সরকার বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ উপেক্ষা করে নিজের বিবেচনায় একের পর এক অধ্যাদেশ জারি করছে, যা প্রকৃত শাসনব্যবস্থার উন্নয়নের বদলে পুরোনো দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকেই পুনরায় প্রতিষ্ঠা করছে। তিনি আরও বলেন, “সংস্কারের নামে তৈরি এসব আইনি কাঠামো দায়মুক্তির সুযোগ সৃষ্টি করছে এবং কার্যত মূলত এই ব্যবস্থা পুরোনো আমলের দৃষ্টিভঙ্গি পুনরাবৃত্তি করছে।”
সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও জানিয়েছেন, সংস্থাটি ধারাবাহিকভাবে আইনের খসড়ার বিশ্লেষণ ও সুপারিশ করে আসছে। এগুলোর মধ্যে কিছু সফলতা দেখা গেলেও অনেক ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলো উপেক্ষিত থাকায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
টিআইবির প্রধান মনে করেন, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন থাকলেও, দুর্নীতির মামলায় জরিমানা বা ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে সাজা মার্জনার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, যা তিনি “দুর্নীতিবাজদের সুরক্ষা দেওয়ার ফাঁদ” হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
অতিরিক্ত তিনি বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা জোরদার করার জন্য কিছু পদক্ষেপ সত্যিই প্রশংসনীয়, যেমন কমিশনার সংখ্যা বাড়ানো, নারী ও আইসিটি বিশেষজ্ঞ অন্তর্ভুক্তি, এবং সরাসরি এফআইআর করার ক্ষমতা। তবে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি প্রতিরোধে কিছু পরিকল্পনার বাতিল এবং আদালতের স্বাধীনতা নিশ্চিত না করাসহ বেশ কিছু ক্ষেত্র এখনও দুর্বল।
পুলিশ কমিশনের সংস্কার প্রসঙ্গে ড. ইফতেখার কঠোর সমালোচনা করে বলেন, বর্তমান অধ্যাদেশ একটি নিরপেক্ষ ও স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের লক্ষ্যে ব্যর্থ। সাবেক পুলিশ ও আমলাদের প্রাধান্য দেওয়া ও অনির্দিষ্ট সংখ্যক কর্মকর্তাকে প্রেষণে নিয়োগের সুযোগ এই নিয়মগুলো সিভিল ও পুলিশি শাসন বিভাগের স্বক্ষমতা কমাবে বলে মনে করেন তিনি।
এছাড়াও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সংস্কার বিষয়ে তিনি বলেন, প্রাথমিক খসড়াটি আন্তর্জাতিক মানসম্মত থাকলেও সংশোধিত সংস্করণে তা অনেকখানি খর্ব হয়েছে। প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে এই কমিশনের অধীন আনার উদ্যোগ স্বাগত হলেও, মন্ত্রিপরিষদ সচিবের অন্তর্ভুক্তি কমিশনের স্বাধীনতা নিয়ে শঙ্কা তৈরি করছে।
সংOverall, টিআইবি মনে করে, এই অধ্যাদেশগুলো, যেগুলোর ওপর গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলো উপেক্ষা করা হয়েছে, বরং দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের মুক্তির পরিবর্তে আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করবে। জুলাই সনদের মূল ভাবনাগুলোর আলোকে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও প্রকৃত সংস্কার নিশ্চিত না হলে এই উদ্যোগগুলো রাষ্ট্রের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।






