দেশের বাজারে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) পর্যাপ্ত পরিমাণে সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না, যা তীব্র সংকট সৃষ্টি করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দাম নিয়ে নৈরাজ্য, যেখানে অনেক ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের দ্বারা দাম বাড়িয়ে ভোক্তাদের নীরব স্বীকারে বাধ্য করছে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিভিন্ন জটিলতায় দেশের কয়টি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বন্ধ হয়ে পড়েছে এবং আমদানিতে সময়মতো অনুমতি না পাওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ বড় পরিমাণে এলপিজির সরবরাহে বাধা সৃষ্টি হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শনে দেখা গেছে, বেশ কিছু দোকানে ‘এলপি গ্যাস নেই’ এই নোটিস ঝুলছে। যে গ্যাসের দাম নির্ধারিত দামে ১ হাজার ৩০০ টাকা, সেটি এখন বাজারে বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার ৫০০ টাকার বেশি। অনেক দোকানই গ্যাস আসছে না বলে জানাচ্ছে, এমনকি কেউ কেউ ফোনের জন্যও সাড়া দিচ্ছেন না। ফলে ভোক্তারা অনেক ক্ষেত্রে অক্সিজেনের মতো গ্যাস খুঁজে ফিরছেন। এ সংকট শুধু ঘরের রান্নার কাজে প্রভাব ফেলছে না, বরং অটোগ্যাসনির্ভর পরিবহন ও ব্যবসা ক্ষেত্রেও তা যুক্ত হয়েছে। বেশ কিছু অটোগ্যাস স্টেশন বন্ধ থাকছে কিংবা দীর্ঘ যানজটে পড়ে গ্যাস নিতে গিয়ে চালকরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন। এই পরিস্থিতির কারণে যানবাহনের জন্যও গ্যাসের সংকট তৈরি হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, দেশে মাসিক এলপিজির চাহিদা এক থেকে দেড় লাখ টন, এর বিপরীতে সরবরাহ মাত্র ৪০ শতাংশ। দেশের মোট ৫ কোটি সিলিন্ডারের মধ্যে শুধু ৮০ লাখের মতো রিফিল হয়। অন্যদিকে, যানবাহনে ব্যবহৃত মাসিক চাহিদা প্রায় ১৫ হাজার মেট্রিক টন হলেও সরবরাহ কার্যত অপ্রতুল। বিভিন্ন কারণে এই সংকটের সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়ছেন খাতের বিশেষজ্ঞরা। এর মধ্যে রয়েছে বৈশ্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে জোটানো, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, জাহাজ সংকট, দীর্ঘস্থায়ী ঋণপত্রের জটিলতা ও অনুমোদনের অভাবে আমদানির ক্ষেত্রে অসুবিধা। এলপিজি অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি হুমায়ুন রশীদ বলেন, দেশে বর্তমানে ২৮টি আইনবদ্ধ এলপিজি কোম্পানি রয়েছে; এর মধ্যে নিয়মিত আমদানি করতে সক্ষম সাত থেকে আটটি। বাকিরা বিভিন্ন জটিলতায় আমদানিতে অক্ষম। এতে দীর্ঘসময় ধরে খুব বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি বাংলাদেশ। তিনি আরও জানান, যদি ব্যাংকগুলো সহযোগিতা করে তাহলে আরও বেশি কোম্পানি আমদানিতে এগিয়ে আসবে এবং বাজারে এলপিজির উদ্বৃত্ত তৈরি হবে। সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ফলেও পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে পারে বলে আশা করছেন তারা। গত ৪ জানুয়ারি, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৫৩ টাকা বাড়িয়ে নতুন দাম ১ হাজার ৩০৬ টাকা নির্ধারণ করে। তবে বাস্তবে এই গ্যাস এখন নগর থেকে গ্রামাঞ্চলেও বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার টাকার ওপরে। বিশ্লেষকদের মতে, এই অপ্রত্যাশিত দামের অন্যতম কারণ হল সরবরাহের জটিলতা ও অসঙ্গতিপূর্ণ ব্যবস্থাপনা। সেফটেক এনার্জি সার্ভিসেস লিমিটেডের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ লিয়াকত আলী বলেন, এলপিজি একপ্রকার আমদানিনির্ভর পণ্য। আমদানি হওয়ার পর বিভিন্ন ধাপে ভোক্তার হাতে পৌঁছাতে হয়। কখনও সরাসরি ডিস্ট্রিবিউটরের কাছে যায়, কখনও অপারেটরের মাধ্যমে বিক্রয় হয়, আবার কখনও সরাসরি ব্যবহারকারীর কাছে যায়। ফলে ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর প্রক্রিয়া বেশ জটিল। তিনি আরও যুক্ত করেন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও সরকারের দায়িত্ব হল সরবরাহ নিশ্চিত করা। যদি সময়মতো উপযুক্ত নীতিমালা ও সহযোগিতা থাকত, তাহলে এই সংকট তৈরি হতো না। এলপিজি ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকারের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ ও সহায়তা থাকলে এ সংকট খুব দ্রুত কাটিয়ে উঠা সম্ভব। তারা আশার আলো দেখাচ্ছেন যে, ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যেই পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে উঠবে। তবে এ জন্য প্রয়োজন সব পক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগ ও নীতির বাস্তবায়ন। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা না গেলে, এর প্রভাব আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।






