গাইবান্ধায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকের নিয়োগ পরীক্ষায় ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মাধ্যমে সংঘবদ্ধ জালিয়াতির ঘটনায় সদর থানায় দায়ের করা মামলায় ২৬ আসামিকে দুইদিনের রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে আদালত। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে গাইবান্ধার চিফ জুডিশিয়াল আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান এই রিমান্ডের আদেশ দেন।
এর আগে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মো. সোহান ৫ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেছিলেন। কিন্তু শুনানি শেষে আদালত প্রত্যেকের জন্য দুদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ডিবি সূত্র জানায়, রিমান্ডে এনে তদন্তকারী কর্মকর্তারা আসামিদের কাছ থেকে ডিভাইস সরবরাহকারী, পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে চুক্তি করা মধ্যস্থতাকারী, প্রশ্ন সমাধানকারী ও বাইরে থেকে রিয়েল-টাইম সাপোর্ট দেওয়া ব্যক্তিদের শনাক্তের জন্য জোরালো তদন্ত চালাবেন। বিশেষ করে পরীক্ষার সময় যোগাযোগব্যবস্থা, অর্থের লেনদেন ও ডিভাইসের উৎস খতিয়ে দেখা হবে।
জানা গেছে, গাইবান্ধা সদর থানায় দায়ের করা মামলায় মোট আসামি রয়েছে ৪০ জন। এর মধ্যে ২৬ জন পুরুষ অবস্থায় গ্রেপ্তার হয়ে আদালতে হাজির করা হয়েছে। ১১ নারী আসামির ক্ষেত্রে মানবিক বিবেচনা ও শিশু সন্তানের বিষয় মাথায় রেখে রিমান্ডে দেওয়ার আবেদন করা হয়নি। তবে এখনো ৩ জন পলাতক রয়েছে।
২০২৩ সালের ৯ জানুয়ারি সম্পন্ন পরীক্ষার দিন গাইবান্ধা সদর, পলাশবাড়ী ও ফুলছড়ি উপজেলার বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে আটক হওয়া পরীক্ষার্থী ও জালিয়াতি চক্রের সদস্যসহ ৫৫ জনের বিরুদ্ধে তিন থানায় মামলা করা হয়। এসব ঘটনায় পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান এসব তথ্য নিশ্চিত করে জানান, আটক পরীক্ষার্থীদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সংঘবদ্ধ জালিয়াতির বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। তারা পরিকল্পনা অনুযায়ী ইলেকট্রনিক ডিভাইস সরবরাহ, বাইরে থেকে প্রশ্ন সমাধান ও রিয়েল-টাইম সাপোর্ট দেওয়ার সঙ্গে জড়িত ছিল। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে পুরো চক্রের মূলহোতার খোঁজ নেওয়া হবে।
মামলার অধীনে, জেলার ৪৩টি পরীক্ষাকেন্দ্রের মধ্যে ২৪টিতে অভিযুক্তদের আটক করা হয়। এর মধ্যে গাইবান্ধা সদর উপজেলার ১৯টি, পলাশবাড়ীর üçটি ও ফুলছড়ির দুটি কেন্দ্র থেকে ৫৭ জনকে আটকে রাখা হয়। এরপর ১০ জানুয়ারি মোট ৫৫ জনের বিরুদ্ধে তিন থানায় নিয়মিত মামলা দায়ের হয়। মামলার বাদী হয় দুই উপজেলা ও গাইবান্ধা সদর উপজেলার একজন করে কেন্দ্রের সচিব ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা।
গাইবান্ধা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার লক্ষ্ণ কুমার দাশ বলেন, মোট ৫৫ জনকে মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনসহ গোয়েন্দা সংস্থা ঘটনার তদন্তে কাজ করছে এবং রিমান্ডে মূল হোতাদের চিহ্নিত করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছে।
পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে, গত ৮ জানুয়ারি জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা স্বাক্ষরিত আদেশে জেলার প্রতিটি পরীক্ষা কেন্দ্রের চারদিকে ২০০ গজের মধ্যে ১৪৪ ধারা জারি করে। ওই দিন দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সভা-সমাবেশ, মিছিল, প্রচারণা ও অননুমোদিত ব্যক্তির প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল।
অনেক আগেই গাইবান্ধায় ডিভাইস জালিয়াতির ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। ২০২৩ সালের ৮ ডিসেম্বর প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে র্যাব ৩৮ জনকে আটক করে। তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের মাস্টার কার্ড, ব্লুটুথ ডিভাইস, মোবাইল ফোন, স্ট্যাম্প ও ব্যাংক চেক উদ্ধার করা হয়।
অপর দিকে, ২০২৪ সালের ১১ জানুয়ারি গাইবান্ধা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের বিভিন্ন পরীক্ষায় ডিভাইস ও প্রক্সি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২৩ সালের ২৫ অক্টোবর চতুর্থ শ্রেণির নিয়োগ পরীক্ষায়ও ডিভাইসসহ এক নারী পরীক্ষার্থী ধরা পড়ে।
এসব একাধিক ঘটনায় প্রাথমিক ও অন্যান্য সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় ডিভাইস জালিয়াতির প্রবণতা বেড়ে গেলে নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, রিমান্ডে থাকা তথ্যের ভিত্তিতে যদি মূল হোতাদের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়, ভবিষ্যতে এ ধরনের সংঘবদ্ধ জালিয়াতি দমন সম্ভব হবে।
উল্লেখ্য, গত ৯ জানুয়ারি দেশের ৬১ জেলার সঙ্গে গাইবান্ধায় প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের লিখিত (এমসিকিউ) পরীক্ষা সম্পন্ন হয়। গাইবান্ধার ৪৩টি কেন্দ্রে মোট ২৭,৬৮৮ জন পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে, যেখানে শূন্য পদের সংখ্যা ছিল ৪০০-র বেশি।






