ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ শাসনামলে নির্বাচনের পূর্ব মুহূর্তে গুমের ঘটনা সাধারণ হয়ে উঠেছিল। এ সময় বেছে বেছে বিএনপি-জামায়াতের নেতা—কর্মী ও সমর্থকদের লক্ষ্য করে তাদের পরিকল্পিতভাবে গুম করা হতো। ২০১২ সালে এই ধরনের ঘটনার সংখ্যা ছিল ৬১টি; এরপরের বছর তা দ্বিগুণেরও বেশি হয়। আবার ২০১৮ সালে গুমের ঘটনায় আগের বছরের চেয়ে বেশি ঘটনা ঘটে। বছরভিত্তিক এই ঘটনা সংগ্রহ করে গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে এ সব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, আওয়ামী লীগের ১৬ বছরের শাসনামলে গুম ঘটনা নিয়মিত ঘটনা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ছাত্র ও জনতার অসাধারণ আন্দোলনের মাধ্যমে ২০২৪ সালে এই সরকার পতনের পর নতুন একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়, যার মাধ্যমে তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়। বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের এই কমিশন ৪ জানুয়ারি তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেয়।
প্রতিবেদনের ১৬ নম্বর পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়, নির্বাচনের আগে বিএনপি ও জামায়াতের নেতা—কর্মীদের ভয়ঙ্করভাবে দেখানো এবং তাদের লক্ষ্য করে গুমের ঘটনা ঘটত। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে বিরোধীদের দমন—পীড়নের অংশ হিসেবে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত তিনটি নির্বাচন ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। ২০১৪ ও ২০২৪ সালে বেশিরভাগ দল নির্বাচন বর্জন করে, আর ২০১৮ সালে অংশগ্রহণ করলেও ভোটের আগে ব্যালট বাক্স ভর্তি করে দেওয়ায় তা ‘রাতের ভোট’ নামে পরিচিত হয়।
প্রতিবেদনটি আরো উল্লেখ করে, গুমের ঘটনা বেড়ে যাওয়া বা কমে আসার সাথে রাজনৈতিক সংকট, নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমস্যা ও নির্বাচনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ২০১৩ সালে গুমের ঘটনাগুলো বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে ২০১৪ সালের নির্বাচন ও সম্পর্ক রয়েছে। একইভাবে ২০১৮ সালের নির্বাচনকালীন পরিস্থিতিতেও এ প্রবণতা দেখা গেছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচনের আগে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীরা বেশি গুমের শিকার হন। এছাড়া, বড় বড় রাজনৈতিক সমাবেশ বা বিক্ষোভের আগেও বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের তুলে নেওয়া হতো যেনো স্বাভাবিক ঘটনা।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, রাজনৈতিক পরিচয়ে গুম হয়েছেন ৯৪৮ জন। এর মধ্যে নিখোঁজ রয়েছেন ১৫৭ জন। গুমের শিকার সবাইকে মিলিয়ে এই সংখ্যা ৯৪৮। এসব গুমের মধ্যে জামায়াত ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সংখ্যা বেশি হলেও নিখোঁজের সংখ্যা বেশি বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের।
মোট নিখোঁজের মধ্যে ৬৮ শতাংশ বিএনপি ও যুবদলের, আর ২২ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের।
রাজনৈতিক পরিচয় আংশিক জানা থাকলে বোঝা যায়, কারা বেশি ঝুঁকিতে ছিল। গুম কি সাধারণ আইনশৃঙ্খলাজনিত নয়, বরং নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল—এ বিষয়টি এই প্রতিবেদনে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হয়েছে।
অভিযোগ আছে, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিরোধীদের দমনমূলক বদধ্যায় গুমের কাজ শুরু করে। কমিশন তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৫৬৪টি গুমের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে ২০১৬ সালে, যেখানে ২১৫টি গুমের ঘটনা রেকর্ডed হয়েছে। এরপর ২০১৭ সালে ১৯৪টি, ২০১৮ সালে ১৯২টি, ২০১৯ সালে ১১৮টি এবং ২০২০ ও ২০২১ সালে যথাক্রমে ৫১ ও ৫৬টি ঘটনা ঘটে। ২০২২ সালে সংখ্যা আবার বাড়ে ১১১০এ, ২০২৩ সালে কমে ৬৫এ এবং ২০২৪ সালে ৪৭টি। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করে পালিয়ে যান।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরলে গুমের ঘটনাও বৃদ্ধি পায়। ২০০৯ সালে গুমের সংখ্যা ছিল ১০টি, এরপর বাড়তে বাড়তে ২০১৩ সালে তা ১২৮টিতে পৌঁছায়। ২০১৪ সালে কিছুটা কমে ৯৫ হয়, কিন্তু পরে আবার বাড়ে; ২০১৫ সালে ১৪১, ২০১৬ সালে ২১৫, ২০১৭ সালে ১৯৪, ২০১৮ সালে ১৯২, ২০১৯ সালে ১১৮, ২০২০ ও ২০২১ সালে যথাক্রমে ৫১ ও ৫৬ এবং ২০২২ সালে ১১০টি। ২০২৩ সালে সংখ্যা কমে ৬৫ হয়ে যায়।
তদন্ত কমিশনে মোট ১৯১৩টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে ১৫৬৯টি অভিযোগ গুমের বিষয় হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে, যার মধ্যে ২৮৭টি নির্দিষ্ট ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ ক্যাটাগরিতে পড়েছে। এই রিপোর্টে রাজনৈতিক দিক থেকে গুমের ঘটনা ও এর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণের মাধ্যমে বোঝানো হলো, কোন দলের নেতা—কর্মীরা বেশি ঝুঁকির ভিতরে ছিল।






