সিরিয়ার সেনাবাহিনী ও কুর্দি নেতৃত্বাধীন সশস্ত্র গোষ্ঠী সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এসডিএফ)-এর মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতি আবারও ১৫ দিনের জন্য বাড়ানো হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয় চার দিনের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পর। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো জানিয়েছে, এই সময়ের মধ্যে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
শনিবার গভীর রাতে সিরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, এই বর্ধিত যুদ্ধবিরতির মূল লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি অভিযানকে সহায়তা করা। এই অভিযানে এসডিএফের নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন কারাগার থেকে আইএসআইএল (আইএস) বন্দিদের স্থানান্তর করা হবে।
এসডিএফ এক বিবৃতিতে উল্লেখ করে, এই চুক্তি উপশমমূলক পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে, বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং দেশের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে বলে তারা আশাবাদী।
এই ঘোষণা পর দেশজুড়ে স্বস্তির বাতাস বইছে। এর আগে চলতি মাসের শুরুর দিকে সিরিয়ার সেনাবাহিনী ও এসডিএফের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়েছিল। মূলত, এসডিএফকে জাতীয় সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে মতবিরোধ থেকেই এই সংঘর্ষের উদ্ভব।
গত দুই সপ্তাহে সিরিয়ার সেনাবাহিনী আলেপ্পো শহর থেকে এসডিএফকে হটিয়ে দেয় এবং দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। এতে গুরুত্বপূর্ণ তেলক্ষেত্র, জলবিদ্যুৎ বাঁধ, এবং আইএসের সদস্য ও তাদের পরিবারের সদস্যদের আটক রাখার বিভিন্ন স্থাপনাও সরকারের দখলে আসে। উল্লেখযোগ্য কিছু স্থান হলো রাক্কা প্রদেশের আল-আকতান কারাগার।
যুদ্ধবিরতি ঘোষণার আগে সিরিয়ার সেনাবাহিনী এসডিএফের শেষ অবস্থান দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। এর মধ্যেই প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা হঠাৎ করে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। তিনি সূচি দেন, এসডিএফকে শনিবার রাত পর্যন্ত সময় দেওয়া হবে—অর্থাৎ বা তারা অস্ত্র সমর্পণ করবে বা সিরিয়ার সেনাবাহিনীর কাছে যোগদান করবে, নতুবা পুনরায় সংঘর্ষ শুরু হবে।
নতুন করে মেয়াদ বাড়ানোর ফলে এসডিএফ তাদের পরিকল্পনা তৈরির জন্য সময় পায়। তারা জানায়, এই সমঝোতা আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার মাধ্যমে হলো এবং দামেস্কের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র এই পরিস্থিতিতে সক্রিয় উদ্যোগ নিয়েছে। ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরে এসডিএফের প্রধান মিত্র হিসেবে কাজ করে আসছে। এখন তারা সিরিয়ার নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এসডিএফের সেনা ও বেসামরিক কাঠামোকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়।
আল-জাজিরার দামেস্ক প্রতিনিধি আইমান ওঘান্না জানায়, আইএস বন্দিদের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য খুবই উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় সংঘর্ষ চলতে থাকলে আইএসের বন্দিরা পালিয়ে যেতে পারে এবং সংগঠনটি নতুন করে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পাবে—এটি অনেকের মনোযোগে রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, চলতি সপ্তাহের শুরুতে হাসাকাহ প্রদেশের একটি কারাগার থেকে শতাধিক আইএস বন্দির পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা এই উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ অভিযান শুরু করেছে। তারা ইরাকে প্রায় ৭ হাজার আইএস বন্দিকে স্থানান্তর করার পরিকল্পনা করেছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এই কাজ সম্পন্ন হওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
তবে, এই আপাত অস্থায়ী স্বস্তির মধ্যেই বড় প্রশ্ন হলো—পরবর্তী কি হবে? কারণ, মূল সংঘর্ষের কারণ অমীমাংসিত রয়ে গেছে। সেটি হলো, এসডিএফ যোদ্ধা ও তাদের নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে কিভাবে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সঙ্গে একীভূত করা হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
উল্লেখ্য, সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতনের পরে, গত বছর মার্চে প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা এসডিএফের সঙ্গে একটি একীভূতকরণ চুক্তিতে সই করেছিলেন। তবে তার বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে মতবিরোধের কারণে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি, যার ফলশ্রুতিতে সাম্প্রতিক সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়।






