এক পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থার কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধারায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এর ফলে বাংলাদেশের কাস্টমস এজেন্সিগুলোর কাজের কৌশল ও গুরুত্বেও নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। আগে যেখানে রাজস্ব আয়ের জন্য কাস্টমসের গুরুত্ব বেশি ছিল, এখন আন্তর্জাতিক খাতে সেই ভূমিকা বিশদ ও বহুমুখী। এখন কাস্টমসের মূল কাজের অন্যতম হলো বাণিজ্য সহজীকরণ, জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করা, পরিবেশ রক্ষা, মেধাস্বত্ব সংরক্ষণ, পাশাপাশি চোরাচালান ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ। এই বহুমুখী দায়িত্ব এবং গুরুত্ব তুলে ধরতে প্রতি বছর বিশ্ব কাস্টমস সংস্থা বা ডব্লিউসিও একটি নির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে দিবসের আয়োজন করে। ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক কাস্টমস দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে “কাস্টমস প্রোটেক্টিং সোসাইটি থ্রু ভিজিল্যান্স অ্যান্ড কমিটমেন্ট”। ডব্লিউসিও-এর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও এই বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে দিবসটি উদযাপন ও পালন করার প্রস্তুতি নিয়েছে। এ দিন কেন্দ্রীয়ভাবে সেমিনার এবং দেশের বিভিন্ন কাস্টমস হাউস ও শুল্ক স্টেশনে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে কাস্টমসের বিভিন্ন সফল কাজ এবং অর্জন তুলে ধরা হচ্ছে।
বাংলাদেশের ফ্রন্টলাইন বর্ডার এজেন্সি হিসেবে বিভিন্ন প্রকৃতি দেশের সমুদ্র, স্থল এবং বিমানবন্দর দিয়ে বাণিজ্য কার্যক্রম সহজতর করার পাশাপাশি দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছে। মাদক, অস্ত্র, অবৈধ স্বর্ণ, মানহীন খাদ্য ও ওষুধের প্রবেশ রোধের লক্ষ্যে কাস্টমসের সতর্কতা অব্যাহত রয়েছে। এই কার্যক্রমের সফলতার জন্য পুলিশ, বিজিবি, গোয়েন্দা সংস্থা, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সাথে নিবিড় সমন্বয় অব্যাহত রয়েছে। তদ্ব্যতীত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার জন্য ডব্লিউটিও-টিএফএ, ডব্লিউসিও-আরকেসি, সিএমএএ, সার্ক, ডি-৮ এবং বেশ কিছু দেশ যেমন তুরস্ক, সৌদি আরব ও জাপানসহ দ্বিপাক্ষিক চুক্তিগুলোর মাধ্যমে সহযোগিতা জোরদার করা হচ্ছে। চোরাচালান শনাক্ত ও প্রতিরোধে ডব্লিউসিও’র প্রযুক্তি – আরআইএলও এবং কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট নেটওয়ার্ক বা সিইএন এর কার্যকর ব্যবহারে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাংলাদেশের কাস্টমসের ভূমিকা অপরিহার্য। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মোট আয়ের প্রায় ২৭ শতাংশই আসে কাস্টমসের মাধ্যমে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের শুল্ক-কর যৌক্তিককরণ, দেশীয় শিল্পের জন্য রেয়াত ও ট্যারিফ সুরক্ষা, বন্ডেড ওয়ারহাউস এবং ডিউটি ড্র-ব্যাক সুবিধার মাধ্যমে রপ্তানি ও বাণিজ্যকে প্রাণবন্ত করা হয়েছে। এলডিসি গ্রাজুয়েশন পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় শুল্ক হার যৌক্তিককরণ ও মেধাস্বত্ব সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন বা বাণিজ্য সহজীকরণে বাংলাদেশের কাস্টমস আধুনিকায়ন ও ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারে জোর দিয়েছে। অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড, আইবাস প্লাস, বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডো (বিএসডব্লিউ) ও অটোমেটেড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার প্রবর্তনের ফলে পণ্যখালাস এখন সহজ, দ্রুত ও কম পেপারলেস। টাইম রিলিজ স্টাডি অনুযায়ী, বর্তমানে ৯০ শতাংশ পণ্য এক দিনেই শুল্কায়ন সম্পন্ন হচ্ছে। এ ছাড়াও, নন-ইনট্রুসিভ ইনস্পেকশন, পোস্ট ক্লিয়ারেন্স অডিট, অর্থনৈতিক অপারেটর (এইও), কাস্টমস বন্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, ই-অকশন এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে বাণিজ্য দ্রুত, ঝুঁকিমুক্ত ও দক্ষ করে তোলার কাজে অব্যাহত কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ কাস্টমস।
প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, মাল্টি-মোডাল পরিবহন ব্যবস্থার সংযোজন এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস ও চোরাচালানকারীদের নতুন কলাকৌশলের কারণে প্রতিনিয়ত নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে কাস্টমস। বিশ্ববাণিজ্যে টিকে থাকতে যথাযথ পেশাদারিত্ব, আন্তর্জাতিক দক্ষতা ও অংশীদারদের সাথে সজাগ সহযোগিতা অপরিহার্য। এই লক্ষ্যে যুগোপযোগী কৌশল গ্রহণ করে বাংলাদেশ কাস্টমস দেশের সব পর্যায় থেকে দেশের ও সমাজের স্বার্থে দায়িত্বশীলভাবে কাজ করে যাচ্ছে, দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষায় অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকায় অবিচল।






