বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনই এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের একমাত্র বাস্তবসম্মত ও টেকসই সমাধান বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গত বুধবার রাতে ঢাকার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর নতুন নিযুক্ত কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ ইভো ফ্রেইজেনের সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাৎকালে তিনি এই মত প্রকাশ করেন। বৈঠকের আলোচ্য বিষয় ছিল রোহিঙ্গা সংকটের বর্তমান পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা এবং বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সাক্ষাৎকালে ড. ইউনূস স্পষ্ট করে বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের মূল শিকড় রয়েছে মিয়ানমারে, যেখানে থেকেই সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে। তিনি আরও বলেন, শরণার্থী শিবিরে দীর্ঘদিন ধরে থাকা রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি কোনভাবেই স্থায়ী সমাধান নয়। সেখানে এখন অসংখ্য তরুণ প্রজন্ম বেড়ে উঠছে, যারা অত্যন্ত হতাশ ও ক্ষুব्ध। প্রযুক্তির সুবিধা থাকলেও কর্মসংস্থান ও জীবনমানের উন্নতিতে অভাব থাকায় এই পরিস্থিতি বিপজ্জনক দিকে মোড় নিচ্ছে। তাই তাদের সম্মান ও নিরাপত্তার সঙ্গে নিজ দেশে ফেরানোর পদক্ষেপই এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
বৈঠকে ইউএনএইচসিআর প্রতিনিধি ইভো ফ্রেইজেন বলেছেন, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে মানবিক সহায়তার জন্য আন্তর্জাতিক তহবিলের নাটকীয় হ্রাসের বিষয়টি উদ্বেগের। তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গাদের আত্মনির্ভরশীলতা ও জীবিকাভিত্তিক কার্যক্রম বাড়ানোর জন্য গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। এর জবাবে ড. ইউনূস জানান, বর্তমান সরকার রোহিঙ্গা ইস্যুতে বৈশ্বিক সক্রিয়তা বাড়াতে রমজান মাসে জাতিসংঘ মহাসচিবের শিবির পরিদর্শনসহ বেশ কিছু উচ্চপর্যায়ের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এরপরও এই সংকটের জন্য আন্তর্জাতিক মনোযোগ যথাযথ নয় বলে দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি। আবার তিনি উল্লেখ করেন, রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ উপস্থিতির ফলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটছে, যা নতুন সামাজিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
আলোচনায় ভাসানচর প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা ও সেখান থেকে রোহিঙ্গাদের মূল ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়ার চ্যালেঞ্জগুলোও উঠে এসেছে। প্রধান উপদেষ্টা জানিয়েছেন, ভাসানচর থেকে অনেকে পালিয়ে গিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে মিলেমিশে যাচ্ছে, যা নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি করছে। ইভো ফ্রেইজেন জানিয়েছেন ইউএনএইচসিআর-এর নতুন প্রধান বারহাম সালিহ শিগগিরই বাংলাদেশে আসবেন, যেখানে তিনি সরেজমিনে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনের পরিকল্পনা করেছেন। ২০১৭ সালের পর থেকে সংস্থাটির উপরমহলের একাধিক সফর এই মানবিক প্রচেষ্টার আন্তর্জাতিক সমর্থনের প্রতিফলন।
বৈঠকের শেষ অংশে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রূপান্তর, আসন্ন নির্বাচন ও গণভোটের বিষয়ে আলোচনা হয়। ড. ইউনূস দৃঢ়ভাবে জানিয়েছেন, বাংলাদেশ একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। তিনি বলেন, “আমরা নতুন একটি জাতীয় মানদণ্ড স্থাপন করতে চাই নির্বাচন পরিচালনায়।” আরও যোগ করেন, এই নির্বাচনকে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও আনন্দময় করে তুলতে সরকার নিরলস কাজ করছে। তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, একটি বিশ্বাসযোগ্য ও সুশৃঙ্খল নির্বাচন উপলক্ষে সকল অঙ্গ-কর্মকর্তা কাজ করছে।






