নির্দেশক অনুভব সিনহা তাঁর নতুন চলচ্চিত্র ‘অসসি’ (আশি) দিয়ে আবারও সমাজের অন্ধকার এক কোণাখানাকে বার করে আনেছেন। ২০ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পাওয়া এই সিনেমা কেবল বিনোদনের ভাবেই নয়—এটি নারী নিরাপত্তা, বিচারব্যবস্থা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রতিবাদ।
চলচ্চিত্রের কাহিনী দিল্লির পটভূমিতে সাজানো। গল্প শুরু হয় পরিমা নামের এক স্কুলশিক্ষিকার অপহরণ ও বর্বর নির্যাতন দিয়ে। পরদিন রক্তাভ মেলে উদ্ধার হওয়া পরিমার বেঁচে থাকার সংগ্রাম, তার পরিবার ও আইনজীবীদের দীর্ঘ ও অক্লান্ত লড়াই কাহিনির প্রধান বহর্স্বর।
পরিমার স্বামী বিনয় চরিত্রে মোহাম্মদ জিশান আইয়ুবের অবিচল ভালোবাসা, ধৈর্য ও মানসিক সংগ্রাম দেখানো হয়েছে সংবেদনশীলভাবে। আইনি লড়াইয়ে রাভি চরিত্রে তাপসী পান্নু যে দৃঢ়তার সঙ্গে দাঁড়ান, তা অনেক দৃশ্যে গল্পকে গতি যোগ করেছে।
আদালতের ভেতরের দৃশ্যগুলো দেখায় কিভাবে ক্ষমতাসীন ও বিত্তশালী পরিবারের প্রভাব, আর পুলিশের দুর্নীতি মামলার গতিবিধি বদলে দেয়। ঘটনার অনুসন্ধান-প্রক্রিয়া থেকে বিচারহীনতার যে করুণ চিত্র ফুটে ওঠে, সেটিই সিনেমার সবচেয়ে কটু বাস্তবতা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘প্রশ্ন’ কবিতার আক্ষেপ বারবার দর্শকের নখে তীক্ষ্ণভাবে খোঁচা দেয়—যেখানে শব্দের মধ্যেই একটি দেশের বিবেক কান্না করে।
কাহিনিতে একটি অজ্ঞাতনামা ছাতাধারী ব্যক্তির আবির্ভাব নাটকীয় মোড় আনে। ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নাকি ন্যায় প্রতিষ্ঠার ছদ্মবেশ—এই প্রশ্নের মধ্যে দিয়ে গল্প এগোয় এবং দর্শককে অব্যাহত অনিশ্চয়তায় রাখে। পারফরম্যান্সগুলো কাহিনীকে প্রাণ দিয়েছে; তবে একই সঙ্গে কিছু চরিত্র গভীরভাবে অন্বেষণের দাবি রাখে।
তাপসী পান্নু রাভি চরিত্রে তার তীক্ষ্ণ উপস্থিতি দেখিয়েছেন। কানি কুসরুতি পরিমার মনের আঘাত ও দুঃস্বপ্ন পর্দায় বসিয়ে দিয়েছেন প্রভাবশালী ভঙ্গিতে। কুমুদ মিশ্রা ও মনোজ পাহওয়ার অভিনয়ও উপযুক্ত ও বিশ্বাসযোগ্য। মোহাম্মদ জিশান আইয়ুবের চরিত্রটি শক্তিশালী ছিল, কিন্তু অনেক দর্শক মনে করেন তার দৃষ্টিকোণ আরও বিস্তৃত করা যেত। নাসিরুদ্দিন শাহর বিশেষ উপস্থিতি প্রশংসার যোগ্য—তবু তার চরিত্রটি কিছুটা অসম্পূর্ণ লাগে।
পরিচালক অনুভব সিনহা ও চিত্রনাট্যকার গৌরব সোলাঙ্কি বাস্তব ঘটনার অনুপ্রেরণায় এই গল্প রচনা করেছেন। চলচ্চিত্রের শিরোনাম ‘অসসি’—আশি—ভারতে ধর্ষণের দৈনিক আনুমানিক সংখ্যা সম্পর্কে একটি কাড়াজোড়া ইঙ্গিত। পিছনের বার্তাটা স্পষ্ট: পরিবারের সহিংসতা রোধে, নারীর মর্যাদা শেখানোর মাধ্যমে এবং বিচারব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এনে সামাজিক পরিবর্তন সম্ভব।
‘অসসি’ এককথায় কড়া আবেদন—এটি আমাদের সমাজকে নিজেরই আয়নায় তাকাতে বাধ্য করে। সিনেমা দেখার পর প্রশ্নটি জাগে: নারীরা কি কখনো নিরবে প্রতিকূলতা ছাড়াই স্বাধীন শ্বাস নিতে পারবে? এই জটিল, নাড়া দেওয়া প্রশ্ন নিয়েই ছবির পর্দা নামল।
সামগ্রিকভাবে ‘অসসি’ একটি সাহসী ও ব্যথানুভূতিপূর্ণ ছবি; যেখানে গল্প, অভিনেত্রী ও ভাবনার মিল মিলে দর্শককে অনুপ্রাণিত ও বিব্রত—উভয়ই করে। চলচ্চিত্রটি সহজ সমাধান দেয় না, বরং আলোচনা, প্রশ্ন ও পরিবর্তনের আহ্বান ছুঁড়ে দেয়।






