দেশে ২০২৫ সালে মোট ৪০৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে, যা উদ্বেগজনক এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। এর মধ্যে স্কুলশিক্ষার্থীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, যেখানে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের আত্মহত্যার হার উল্লেখযোগ্য। এই তথ্যগুলো প্রকাশিত হয়েছে আঁচল ফাউন্ডেশনের এক সমীক্ষায়, যা শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপন করা হয়। এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এই সংখ্যা আত্মহত্যার শুধুমাত্র পরিসংখ্যান নয়, বরং এর পেছনে পারিবারিক কাঠামো, সামাজিক সম্পর্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ছোটে বোঝা যায়।
আঁচল ফাউন্ডেশনের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২৫ সালে সারাদেশে মোট ৪০০টির বেশি শিক্ষার্থী, অর্থাৎ ৪০৩ জন, আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। এর আগে, ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩১০। বিভিন্ন স্তরে এই আত্মহত্যার কারণ বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় ২৮ শতাংশ শিক্ষার্থী হতাশায়, ২৩ শতাংশ অভিমানে আত্মহত্যা করেছে। লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেশি — ৫৫ শতাংশ হতাশায় এবং ৬২ শতাংশ অভিমানে, যেখানে পুরুষের মধ্যে এ হার যথাক্রমে ৪৫ ও ৩৮ শতাংশ। এর পাশাপাশি প্রেমের সম্পর্ক, পারিবারিক কলহ, মানসিক অস্থিতিশীলতা ও যৌন নির্যাতনের ঘটনাও উল্লেখযোগ্য।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এই মৃতের সংখ্যা ৭৭ জন, যার মধ্যে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ৪৪ জন, বেসরকারি ১৭, মেডিকেল কলেজে ৬ ও বিভিন্ন কলেজ ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অন্যরা। সংক্ষেপে, মূলত স্কুলপর্যায়ে সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যা ঘটেছে, যেখানে ১৯০ জন বা ৪৭.৪ শতাংশ— বিষয়টি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ এই বয়সের শিশুরা কৈশোরের সূচনালগ্নে থাকে ও মানসিক ও আবেগের বিকাশের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল অবস্থায় থাকে।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালে নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেশি, যেখানে ২৪৯ জন বা ৬১.৮ শতাংশ নারী এবং ১৫৪ জন বা ৩৮.২ শতাংশ পুরুষ আত্মহত্যা করেছেন। স্কুলে ১৩৯ নারী ও ৫১ পুরুষ, কলেজে পর্যায়ক্রমে আরও নারীদের বেশি দেখা গেছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পুরুষের সংখ্যা sedikit বেশি। এ তথ্যগুলো থেকে বোঝা যায়, মেয়েদের ক্ষেত্রে সামাজিক ও পারিবারিক চাপ, সম্পর্কের টানাপড়েন ও আবেগপ্রবণতা বেশি ক্ষত সৃষ্টি করছে। পুরুষ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা, কর্মসংস্থান সংকট ও পরিচয় হারানোর সমস্যা বড় ভূমিকা রাখছে।
বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকার বিভাগে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি, যেখানে ২০২৫ সালে আত্মহত্যা করেন ১১৮ জন বা ২৯.২৪ শতাংশ। সাধারণত জনসংখ্যা ঘনত্ব, নগরায়ণ, প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষা পরিবেশ ও পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা এই প্রবণতা বৃদ্ধিতে অবদান রাখছে। চট্টগ্রাম, বরিশাল, রাজশাহী বিভাগের অনুসারে এই সংখ্যা যথাক্রমে ৬৩, ৫৭ ও ৫০ জন।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের কনসালটেন্ট ফরেনসিক সাইকিয়াট্রিস্ট ডা. আনিস আহমেদ, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সৈয়দ মাহফুজুল আলম, টাঙ্গাইল মেডিক্যাল কলেজের সহকারী পরিচালক ডা. মারুফ আহমেদ খান, আঁচল ফাউন্ডেশনের সভাপতি তানসেন রোজ, ও প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর সোহেল মামুন।
সংগঠনের পক্ষ থেকে আত্মহত্যা প্রতিরোধে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়, এর মধ্যে রয়েছে: সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও স্ক্রিনিং চালু, শিক্ষক ও সহপাঠীদের মানসিক স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ, সামাজিক স্টিগমা কমাতে প্রচার অভিযান, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মানসিক স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ, এবং অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি আয়োজন। এই সমাধানগুলো মানবিক ও কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে নেয়া অত্যন্ত জরুরি, যেন ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর আর যেন কোনও ক্ষতিকর প্রভাব না পড়ে।






