মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে উত্পন্ন অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের সরবরাহ শৃঙ্খলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক শিপিং থেকে শুরু করে অভ্যন্তরীণ পণ্যবাহী যানজট—প্রায় সব স্তরেই ফ্রেইট ও জ্বালানি খরচ বাড়ছে, যার ফল দানা বাঁধছে ভোক্তা পর্যায়েও।
শিপিং কোম্পানিগুলো জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব মোকাবিলায় বড় অঙ্কের ‘বাঙ্কার সারচার্জ’ আরোপ করেছে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২৮ ফেব্রুয়ারির আগের সময় কনটেইনার প্রতি বাঙ্কার সারচার্জ ছিল প্রায় ৭০০–৭৫০ ডলার। এখন এটি বেড়ে প্রায় ৩,৫০০ ডলার পর্যন্ত উঠে এসেছে। এর পাশাপাশি রয়েছে ওয়ার রিস্ক প্রিমিয়াম, অর্থাৎ যুদ্ধকালীন ঝুঁকির অতিরিক্ত ফি।
চট্টগ্রাম থেকে ইউরোপ রুটের কনটেইনারের বেজ ফ্রেইট প্রায় ১,০০০–১,২০০ ডলার। সেখানে ৩,৫০০ ডলারের বাঙ্কার সারচার্জ যোগ হলে আমদানি-রফতানিকারকের কনটেইনারপ্রতি মোট খরচ প্রায় ৫,০০০ ডলার পর্যন্ত উঠছে—যা সরাসরি পণ্যের মূল্যে চাপ তৈরি করবে।
চাপ কেবল আন্তর্জাতিক সাগরতেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশীয় জ্বালানি সংকটের ফলে অভ্যন্তরীণ পরিবহনে খরচও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। উদাহরণ হিসেবে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে একটি কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া ইতিপূর্বে ১৫–১৬ হাজার টাকা হলেও গতকাল সেটি এক লাফে ২৫ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাসে ব্যবহৃত লাইটারেজ জাহাজগুলোও যাতায়াতে প্রয়োজনীয় ডিজেল সংগ্রহে সমস্যায় পড়ছে।
ট্রাক মালিকরা জানাচ্ছেন, সরকারের নির্ধারিত দাম থাকা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রেই চালকরা কালোবাজারি দামে ডিজেল কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির সভাপতি মো. তোফাজ্জল হোসেন মজুমদার বলেন, ঢাকা–চট্টগ্রাম রুটে এক দফায় ট্রাকের জন্য প্রায় ১৪০–১৬০ লিটার ডিজেল লাগে, অথচ পাম্প থেকে চালকরা মাত্র ২০–৫০ লিটার তেল পাচ্ছেন। ‘‘সরবরাহ সচল রাখতে আমরা বাধ্য হয়েই কালোবাজার থেকে লিটার দরে ১২০ টাকা দিয়ে তেল কিনছি,’’ তিনি বলেন, যেখানে সরকারি দাম প্রায় ১০০ টাকা। তিনি দ্রুত কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহের দাবি জানান।
ডিজেল সংকটের প্রভাব ইতোমধ্যে শিল্প ও নির্মাণ খাত পর্যন্ত পৌঁছাতে শুরু করেছে। পরিবহন খরচ বাড়ায় সরবরাহশৃঙ্খলে ঢেউ পড়ছে—পরবর্তী ধাপে সাধারণ ভোক্তার ওপর মূল্যচাপ বাড়ার আশঙ্কা বেড়েছে। লালমনিরহাটের নির্মাণসামগ্রী ব্যবসায়ী হামিদুল রহমান তুষার জানান, রুটভেদে ট্রাক ভাড়া এই ধাক্কায় ৩–৭ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। আগে নারায়ণগঞ্জ বা ঢাকা থেকে ছোট ট্রাক ভাড়া ছিল ১৩–১৪ হাজার টাকা, এখন তা ১৭–১৮ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাস্টমার, ব্যবসায়ী ও পরিবহন মালিকরা দ্রুত ও সংগঠিত পদক্ষেপ চান—বিশেষত জ্বালানি’র সমন্বিত সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং কৃত্রিম কালোবাজারি রোধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। সরবরাহশৃঙ্খল ভেঙে না পড়ার জন্য সময়োপযোগী নীতি এবং কার্যকর মনিটরিং এখন অপরিহার্য বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।






