বাংলাদেশ বর্তমানে জাপানি কোম্পানিগুলোর জন্য দ্রুত বিকশিত এবং উচ্চ সম্ভাবনাময় এক কেন্দ্রস্থলে পরিণত হচ্ছে। এর ফলে প্রাথমিকভাবে তাদের লাভের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং স্থানীয় বাজারে ব্যবসার ব্যাপক বিস্তারে তাদের আগ্রহও দিন দিন বাড়ছে। রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ‘জাপান বিজনেস ডে’ অনুষ্ঠানে এ তথ্য তুলে ধরা হয়, যেখানে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং বাংলাদেশি বিনিয়োগ সংস্থা বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন উপস্থিত ছিলেন।
জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গনাইজেশন (জেট্রো) ঢাকা অফিসের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ কাজুইকি কাতাওকা জানিয়েছেন, ২০২৫ অর্থবছরের জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে কার্যরত জাপানি কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৫৬.৯ শতাংশ আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করেছে। তিনি উল্লেখ করেছেন, এই সম্প্রসারণের প্রবণতা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর সঙ্গে সমান উন্নতি করছে, যার মূল কারণ হচ্ছে স্থানীয় বাজারে চাহিদার উদ্বেগজনক বৃদ্ধি—এমনটাই বলছেন ৬৬.৭ শতাংশ কোম্পানি।
কাতাওকা আরও বলেছেন, বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নতির方向ে এগিয়ে যাচ্ছে। ২০২৫ সালে দেশের প্রায় অর্ধেক জাপানি কোম্পানি পরিচালন লাভের আশায় রয়েছে, যা আগে থেকে উল্লেখিত ৪১.৯ শতাংশের চেয়ে বেশি। অ-উৎপাদন খাতে এই সম্প্রসারণের আগ্রহ বেশি, যেখানে ৬২.২ শতাংশ প্রতিষ্ঠান এগোতে চায়, আর উৎপাদন খাতে এর হার ৪৭.৬ শতাংশ।
বাংলাদেশের বৃহৎ ভোক্তা বাজার এবং ধারাবাহিক অর্থনৈতিক উন্নতি বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্টের জন্য বড় কারণ হিসাবে দেখা হচ্ছে। দেশের ১৮ কোটির বেশি জনসংখ্যা এবং গত দশকে ৫-৬ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিচ্ছে। কাতাওকা বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের নবম বৃহৎ ভোক্তা বাজারে পরিণত হতে পারে এবং বর্তমানে যুক্তরাজ্যকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। মাথাপিছু আয়ের ধারেকাছে প্রায় ৩ হাজার ডলার পৌঁছানোর ফলে জাপানি ব্র্যান্ডগুলো এখন সরাসরি স্থানীয় ভোক্তাদের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।
বর্তমানে দেশে প্রায় ৩৫০টি জাপানি কোম্পানি সক্রিয় রয়েছে, যেখানে বিশেষ করে ভোক্তা ও খাদ্যসেক্টর উল্লেখযোগ্য। এফএমসিজি, খাদ্যপ্রক্রিয়াজাতকরণ, ইলেকট্রনিকস, অটোমোবাইল এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতগুলোতে তাদের উপস্থিতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইতিমধ্যেই লায়ন করপোরেশন, আজিনোমোটো, কিউপি, কিকোম্যান, মিতসুবিশি (র্যানকন), হোন্ডা ও শিপ ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতাল তাদের কার্যক্রম বিস্তার করছে।
বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুবিধাগুলোর মধ্যে রয়েছে স্বল্প শ্রম খরচ, বৃহৎ বাজার, দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, এবং ভাষাগত অসুবিধা কম হওয়া। এ ছাড়াও, মানবাধিকার সংক্রান্ত দিকেও বাংলাদেশ এগিয়ে আছে, যেখানে ৪০.৭ শতাংশ কোম্পানি ইতিমধ্যেই দ্য ডিউ ডিলিজেন্স (মানবাধিকার) নীতিমালা বাস্তবায়ন করেছে।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই ‘বাংলাদেশের সঙ্গে ইপিএ চুক্তি স্মারক’ উপলক্ষে স্বাগত বক্তব্য দেন জাপান দূতাবাসের অর্থনৈতিক বিভাগের প্রধান ইউতারো মোচিদা। পরে অনলাইনে বক্তব্য দেন জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপ-মহাপরিচালক (রাষ্ট্রদূত) ইজুরু কোবায়াশি। এছাড়া বক্তব্য দেন জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তারেক রাফি ভূঁইয়া ও বাংলাদেশের নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত শিনিচি সাইদা।
তারেক রাফি বলেন, এখন বাংলাদেশ ও জাপানের সম্পর্ক নতুন এক পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে, যেখানে উন্নয়ন সহযোগিতার পাশাপাশি একটি নীতিনির্ভর অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব গড়ে উঠছে। তিনি উল্লেখ করেন, প্রস্তাবিত বাংলাদেশ-জাপান ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (ইপিএ) এলডিসি হিসেবে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায় করবে।
উল্লেখ্য, এলডিসি (অপ্রতিষ্ঠিত দেশ) হিসেবে বাংলাদেশের গ্রেডিং বাদ যাওয়ার কারণে জিএসপি (সাধারণised System of Preferences) সুবিধা বন্ধ হচ্ছে, যা মোকাবেলায় এই ইপিএ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিকেলের সেশনে জেট্রো ২০২৫ সালের জরিপের ভিত্তিতে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়, যেখানে এশিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলে জাপানি কোম্পানির ব্যবসায়িক পরিস্থিতির উপস্থাপন করা হয়। এছাড়াও বাংলাদেশে জাপানের আগ্রহ নিয়ে উপস্থাপন করেন জেট্রোর ঢাকার প্রতিনিধি তোমোতাকা মিনোউরা ও সিনিয়র ডিরেক্টর শরিফুল আলম।
অবশেষে, সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন এক প্যানেল আলোচনা, যেখানে বিডা, জাপানি ব্যবসায়ী সংগঠন, মিতসুবিশি কর্পোরেশন, অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার এবং পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।






