পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত ২১ ঘণ্টার বৈঠক শেষে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের শান্তিচর্চা সফল হয়নি। আলোচনা সমাপ্তির কথা প্রকাশ্যে আনার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি জেডি ভ্যান্স বলেন, তেহরানকে ‘চূড়ান্ত ও সর্বোত্তম প্রস্তাব’ দেওয়ার পর তারা আলোচনার টেবিল ছেড়ে যাচ্ছে। দুই পক্ষই একে অপরকে দায়িত্ব চাপিয়েছে এবং অনেক অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে — যা অনেকে বলছেন, শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, সমগ্র বিশ্বের জন্য প্রভাব বয়ে আনতে পারে।
আলোচনায় প্রধান বিবাদবিন্দুগুলো ছিল ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম, বিদেশে জব্দ থাকা ইরানি সম্পদ মুক্ত করার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সময়সূচি এবং হরমুজ প্রণালী নিয়ে নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন ইরান থেকে ‘‘পরমাণু অস্ত্র তৈরি না করার’’ বিষয়ে স্পষ্ট ও যাচাইযোগ্য প্রতিশ্রুতি চেয়েছে; ইরান hingegen ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ বা সীমিত করা নিজেদের অধিকার হিসেবে দেখা থেকে অনরম্য বাজে।
অর্থনৈতিক শর্তও আলোচনা জটিল করে তুলেছে। ইরান চেয়েছিল বিদেশে জব্দ থাকা বিপুল অর্থ ও সম্পদ মুক্ত করা হোক এবং নিষেধাজ্ঞা দ্রুত প্রত্যাহার করা হোক; যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে নমনীয়তা দেখাতে ইচ্ছুক হলেও তাৎক্ষণিক ছাড় দিতে রাজি হয়নি। ফলে এ ইস্যুয়েই বড় অচলাবস্থা তৈরি হয় বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিশ্লেষকদের খন্ডিত করে বলা হচ্ছে।
আলোচনায় হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তাও কেন্দ্রে ছিল। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক‑পঞ্চমাংশ এই জ্বালানি রুট দিয়ে চলাচল করে; তাই এখানে কোনোরকম ব্যাঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও আঘাত হানা সম্ভব। যুক্তরাষ্ট্র মাইন অপসারণকারী জাহাজ পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে, আর ইরানি গণমাধ্যম কিছু বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘‘অতিরিক্ত দাবি’’ উত্থাপন করেছে বলে সংবাদে বলা হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের দাবিকে ‘অযৌক্তিক’ উল্লেখ করে দাবি করেছে, ইরানি প্রতিনিধি দল ২১ ঘণ্টা নিবিড় আলোচনা চালিয়ে দেশের স্বার্থ রক্ষা করার চেষ্টা করেছে; তবু যুক্তরাষ্ট্রের শর্তই আলোচনার অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করেছে। ওয়াশিংটন পক্ষ থেকে আবার বলা হয়েছে, ইরান মৌলিক প্রতিশ্রুতি দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
পটভূমি: সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে যে সহিংসতা দেখা দিয়েছে, সেটিও আলোচনায় প্রেক্ষাপট হয়ে আছে। কয়েক ধরনের হামলার প্রতিত্বরূপ প্রতিক্রিয়া এবং উভয়পক্ষের সামরিক প্রস্তুতির কারণে অঞ্চলটি ইতিমধ্যে সংকটাপন্ন। আলোচনার জন্য দুই সপ্তাহের সময় পর্যবেক্ষণ ভিত্তিতে হামলা স্থগিত রাখার মতো উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল, তবে এ বিরতি স্থায়ী সমাধানে পরিণত হয়নি বলে এখন মনে করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলেন, এই ব্যর্থতা আকস্মিক নয়; বরং বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা অবিশ্বাস, কৌশলগত স্বার্থ সংর্ঘষ ও জটিল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতারই ফল। দ্য গার্ডিয়ান, আল জাজিরা, রয়টার্স ও দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের মতো প্রকাশনাগুলোও একইরকম তর্ক বিশ্লেষণ করেছে।
এখন কী হবে? বেশ কিছু সম্ভাব্য পথ খোলা আছে: কূটনৈতিক চেষ্টার অব্যাহত রাখার মাধ্যমে সময় নিয়ে সমঝোতা অনুসন্ধান, বা আশঙ্কা মতো উত্তেজনা বাড়ায় নতুন সামরিক পদক্ষেপ— উভয়ই সম্ভব। বিবিসি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আপাতত ইরানের ওপর নতুন কোনো বড় আক্রমণের ঘোষণা নেই, কিন্তু সংঘর্ষের সম্ভাবনা দ্রুত বেড়েছে।
সংক্ষেপে, ইসলামাবাদে এই আলোচনা ছিল দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একটি বিরল সুযোগ। তা ব্যর্থ হওয়ায় তাত্ক্ষণিকভাবে শীতল বাতাবরণ গড়ে উঠেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে এর নেগেটিভ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে। কূটনীতি, আস্থা পুনর্গঠন ও বহুপাক্ষিক চাপ ছাড়া পরিস্থিতি শিথিল করা সহজ হবে না বলে কূটনীতিক ও বিশ্লেষকরা মনে করছেন।






