প্রায় ২৯ বছর ধরে বন্ধ থাকা ফেনী—বিলোনিয়া রেলপথ এখন কেবল স্মৃতি। এক সময় কর্মচঞ্চল এই লাইনটি রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, ভূ-সম্পত্তি দখল এবং কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে ধ্বংসের পথে পড়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি পুনরায় চালু হলে স্থানীয় যোগাযোগ ও বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যে নতুন গতি আসতে পারে।
ঐতিহাসিকভাবে জানা যায়, ১৯২৭ সালের ১৭ ডিসেম্বর আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি কর্তৃক সরকারী আদেশে ফেনী থেকে বিলোনিয়া পর্যন্ত রেলপথ স্থাপনের জন্য ২৫ গ্রামের ২৭৭ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। ১৯২৯ সালে আঞ্চলিক যোগাযোগের উদ্দেশ্যে সার্ভিস চালু হলে বন্ধুয়া, দৌলতপুর, আনন্দপুর, পীরবক্স, মুন্সির হাট (পুরাতন ও নতুন), ফুলগাজী, চিথলিয়া, পরশুরাম ও বিলোনীয়া—মোট আটটি স্টেশন চালু হয়। সরকারের তথ্য ও স্থানীয় বর্ণনা মিলিয়ে ঐ সময় এটি ওই অঞ্চলের শিক্ষা, ব্যবসা ও জীবিকোপার্জনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল।
স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে সড়ক যোগাযোগের বিকাশে রেলভ্রমীর সংখ্যাটা কমতে থাকে। ১৯৯৭ সালের ১৭ আগস্ট ‘লোকসানী’ বলে আনুষ্ঠানিকভাবে লোকাল সার্ভিস বন্ধ ঘোষণা করা হয় এবং এরপর থেকে রেললাইন ও স্টেশনগুলো পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে।
সরেজমিন দেখা যায় রেললাইনের ওপর স্থায়ী ঘরবাড়া, দোকানপাট ও বিভিন্ন ব্যবসা গড়ে উঠেছে। রেলের কঙ্কাল―স্লিপার, পাথর, লোহার প্লেট—অনেকে চুরি করে নিয়ে গেছে। বন্ধ হয়ে থাকা স্টেশনগুলোর ভবনগুলো লতাপাতা ও ভাঙাচোরা অবস্থায়, কোথাও ইট খুলে নিয়ে গেছে স্থানীয়রা। বহু স্টেশন এখন মাদক-বেচাকেনা ও বখাটেদের আড্ডা স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে; নানান স্থানে ভাসমান শ্রমিকদের দখলও লক্ষ্য করা যায়।
স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ফুলগাজীর মুন্সিরহাটের বাসিন্দা ফরিদ আহমেদ বলেন, রেলের মূল্যবান ভূমির বেশিরভাগ অংশ প্রভাবশালীদের দ্বারা দখল হয়ে গেছেন, গাছ কাটা হয়েছে, আর কোটি কোটি টাকার সম্পদ মাটিতে মিশে যাচ্ছে। পরশুরামের আবু ইউসুফ মিন্টু জানান, তারা বারবার শুধু আশ্বাসনই শুনেছে; দ্রুত পুনরুদ্ধার না হলে ভবিষ্যতে মানচিত্র থেকেই এই রেললাইনের নাম মুছে যেতে পারে।
কয়েকটি চুরি হওয়া রেললাইন উদ্ধারও হয়েছে; এসব ঘটনার জন্য লাকসাম জিআরপি থানা ও আশপাশের থানায় অন্তত আটটি মামলা করা হয়েছে। লাইন বন্ধ থাকার পর রক্ষা-রক্ষকরা ও কর্মচারীরা বিভিন্ন স্থানে বদলি হওয়ায় রক্ষণাবেক্ষণ থেমে যায়। রেলের জমি উদ্ধারে উচ্ছেদ অভিযান চলছে—একই সঙ্গে রুটটি পুনরায় চালুর ব্যাপারটি সম্পূর্ণ নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল বলে সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান।
পুনরুদ্ধার ও পুনরায় চালুর সম্ভাব্যতা নিয়ে স্থানীয়রা আশাবাদী। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে তাদের অংশ পর্যন্ত ব্রডগেজ সম্প্রসারণ করা হয়েছে; তাই বাংলাদেশের ২৮ কিলোমিটার অংশ সংস্কার করলে বিলোনিয়া স্থলবন্দর আরও গতিশীল হবে, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সরাসরি উত্তর-পূর্ব ভারতে পণ্য পাঠানো সহজ হবে এবং ফুলগাজী-পরশুরামের মতো উত্তরাঞ্চলের মানুষের কর্মসংস্থানে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
তবে তথ্যগুলোতে কিছু বিভ্রান্তি দেখা যায়। ইতিহাসে লাইনটির দৈর্ঘ্য সাধারণত ২৮ কিলোমিটার হিসেবে বলা হয়েছে, কিন্তু রেলওয়ের এক কর্মকর্তা সম্প্রতি লাইনটি প্রায় ৭৩ কিলোমিটার বলায় দৈর্ঘ্য সম্পর্কে মিশ্র তথ্য প্রকাশিত হয়েছে—এই ধরনের অসঙ্গতি মাঠ পর্যায়ে পরিমাপ ও নথিপত্র যাচাই করে ঠিক করা প্রয়োজন।
বিভিন্ন সময়ে সমীক্ষা চালানো হয়েছে এবং বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ উদ্যোগে সংস্কারের পরিকল্পনা নেওয়া হলেও মাঠ পর্যায়ে দৃশ্যমান কোনো কাজ শুরু হয়নি। ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য মুন্সী রফিকুল আলম মজনু বলেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে তারা লাইন চালু করার চেষ্টা করছেন, তবে এলাকায় কিছু মানুষ হয়ত অন্য উন্নয়নের দাবি জানায়।
বিশ্বস্ত সাংবাদিক ও স্থানীয়রা এক সুস্পষ্ট দাবিাজ্ঞাপন করছেন—রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সঠিক পরিকল্পনা থাকলে বন্ধ এই রেললাইন আবারও ‘ঝকঝক’ শব্দে কেঁপে উঠবে। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও দায়িত্বশীল উদ্যোগেই এই ঐতিহ্যবাহী রুটটিকে পুনরায় জীবন্ত করে তোলা সম্ভব হবে, বলে তারা মনে করেন।






