অন্তর্বর্তী সরকারের অবহেলাজনিত কারণে দেশে হামের সংক্রমণ উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলেছে। ইতিমধ্যে ৫৮ জেলায় এই সংক্রমণ ছড়িয়েছে, যা দেশের মোট জেলাগুলোর প্রায় ৯১ শতাংশ। শিশুদের জন্য এই প্রচণ্ড টিকা না দেওয়া পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। দিন দিন মৃত্যুর সংখ্যাও ব্যাপক হারে বাড়ছে, প্রতিদিনই শিশুরা মৃত্যুবরণ করছে এবং নতুন করে সংক্রমিত হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত বৃহস্পতিবার সকাল আটটা থেকে শুক্রবার সকাল আটটার মধ্যে আরও ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে হাম বা হামের উপসর্গ নিয়ে। এ পর্যন্ত মোট মৃত্যুর সংখ্যা ১৯৮ জন। এই পরিস্থিতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশের হামের পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং এটি দেশকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে মূল্যায়ন করেছে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টি জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ঢাকার বিভাগ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, যেখানে সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা হাজারের বেশি। ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীরচর, কড়াইল, মিরপুর ও তেজগাঁও ছিল সংক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু। এছাড়া রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগেও সংক্রমণ জোরালো হয়ে উঠেছে।
প্রধান সমস্যা হলো, পাঁচ বছরের কম বয়সের শিশুরা হাম থেকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে৷ আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৭৯ শতাংশেরই বয়স পাঁচ বছরের নিচে। এর মধ্যে ৬৬ শতাংশের বয়স দুই বছরের নিচে এবং ৩৩ শতাংশের মোটের ওপর, অর্থাৎ নয় মাসের নিচে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মৃত্যুর বেশিরভাগ শিশুই টিকা নেয়নি বা আংশিক টিকা পেয়েছে। মূলত ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে এই রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ২০২৪-২৫ সালে এই টিকা ঘাটতির কারণে এই পরিস্থিতি ধারালো হতে পারে। ২০০০ সালে এই টিকার কভারে ছিল ৮৯ শতাংশ, যা এখন অনেক কমে গেছে। তদ্ব্যতীত, ২০২০ থেকে কোনো নিয়মিত টিকা কর্মসূচি চালু না থাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
এছাড়াও, অপুষ্টি ও ভিটামিন এ অভাবের কারণে শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অন্ধত্ব ও নিউরোলজিক্যাল জটিলতা বাড়ছে, যা মৃত্যুর ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক পরামর্শক ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে হাম মহামারি আকারে রূপ নিয়েছে। দেশের সরকারের উচিত জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ঘোষণা করে দ্রুত টিকাদান কার্যক্রম চালু করা।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা সব বয়স্ক মানুষের পাশাপাশি ছোটদের মধ্যে সংক্রমিত করতে পারে। বাতাসের মাধ্যমে ছড়ানোর পাশাপাশি, আক্রান্তের নাক ও মুখ থেকে নিঃসৃত ড্রপলেটের মাধ্যমে এই রোগ সহজেই ছড়ায়। সংক্রমণের সাধারণ সময়কাল ১০ থেকে ১৪ দিন, তবে তা ৭ থেকে ২৩ দিন পর্যন্ত হতে পারে। মুখে চোখে, নাক ও গলায় সাদা ছোট সাদা দাগ, উচ্চ জ্বর, সর্দি, কাশি এর প্রধান উপসর্গ।
হামের কোনও নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিত্সা বর্তমানে পাওয়া যায়নি। অধিকাংশ মানুষ দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠে। তবে ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর জন্য এটি মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে, বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম শিশু, অপুষ্টি আক্রান্ত ও ভিটামিন এ ঘাটতিযুক্ত শিশুদের জন্য।
প্রাদুর্ভাবের পূর্বে বাংলাদেশ হাম প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছিল। টিকা কভারেজ ২০০০ সালে ৮৯ শতাংশ থেকে ২০১৬ সালে বেড়ে ১১৮ শতাংশে পৌঁছেছিল। দ্বিতীয় ডোজের সম্প্রসারণের পর ২০১২ সালে কভারেজ ২২ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে বেড়ে ১২১ শতাংশ হয়েছে। তবুও, এ পর্যন্ত বিভিন্ন পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা কমলেও সংক্রমণের হার বাড়ছেই।
বিশ্বের মধ্যে হাম নিরাময়ে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি করলেও, বর্তমানে ঝুঁকি ‘উচ্চ’ হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। অপ্রতুল টিকা গ্রহণ, আংশিক টিকা প্রাপ্ত শিশুর সংখ্যা ও সংক্রমণের ব্যাপকতা এই ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তাই জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে এই মহামারি প্রতিরোধের জন্য সরকারের আরও আন্তরিক ভূমিকা পালন করতে হবে।






