মোটরসাইকেলের বেপরোয়া ব্যবহার তরুণ-কিশোরদের জন্য এক নীরব মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। শখ আর রোমাঞ্চ খুঁজতে গিয়ে অনেকে ‘স্পিড’ নেশায় জড়িয়ে পড়ছে, আর প্রতিদিনই সড়কে ঝরছে প্রাণ।
পরিসংখ্যান বলছে, গত পাঁচ বছরে মোটরবাইক দুর্ঘটনায় দেশজুড়ে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গেছেন; এর একটি বড় অংশই কিশোর ও তরুণ। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যে বলা হয়েছে, গত মার্চ মাসে সারাদেশে ৫৭৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৩২ জন নিহত এবং ২ হাজার ২২১ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে নারী ৬৬ জন এবং শিশু ৯৮ জন। মোট মৃত্যুর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ২০৪ জন — যা মোট মৃত্যুর ৩৮.৩৪ শতাংশ।
জাতীয় অর্থপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (পঙ্গু হাসপাতাল) সূত্র জানায়, প্রতিদিন গড়ে এক হাজারের বেশি রোগী আসছে; তাদের কমপক্ষে ৩০ শতাংশই মোটরবাইক সংঘটিত দুর্ঘটনার শিকার। এই রোগীর বড় একটি অংশ কিশোর ও তরুণ।
ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ বলছে, রাজধানীতে মোটরবাইক দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলো হলো— বেপরোয়া গতিতে চালানো, রাতে রেসিং করা, সিগন্যাল না মানা এবং যানবাহনের অনুপযোগী ফিটনেস। উদ্বেগের বিষয়, অনেক কিশোর-তরুণই লাইসেন্সবিহীনভাবে বাইক চালায়; আবার কাগজে-কাঠগড়ায় দেখা যায় বয়স কম থাকলেও কেউ কেউ লাইসেন্স সংগ্রহ করছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নগর জীবনের দ্রুত চলাচলের প্রতীক হিসেবে মোটরসাইকেল গ্রহণযোগ্য হলেও, এটি বিশেষ করে ১৫ থেকে ২৪ বা ২৫ বছর বয়সী তরুণদের জন্য মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে। সাম্প্রতিক মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, এই বয়সসীমার প্রায় ৭০ শতাংশ দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুতে মোটরসাইকেল জড়িত।
বেপরোয়া গতির নেশা ও ঝুঁকিপূর্ণ স্টান্ট কিশোরদের মধ্যে সাধারণ। স্কুল-কলেজপড়ুয়া অনেকেই বন্ধুদের সঙ্গে দলবেঁধে উচ্চগতিতে বাইক চালায়, কখনও স্টান্ট করতে গিয়ে, কখনও টিকটকের জন্য ভিডিও ধারণের সময় জীবন হারায়। তথ্য বলছে—লাইসেন্স পাওয়ার ন্যূনতম বয়স ১৮; তবু ১২ থেকে ১৮ বছরস্বরূপ অনেক শিশু-কিশোরই পথ ঘোলা করে পড়ে। তাদের কোনো বৈধতার অভাবও এই বিপদের বড় কারণ।
পুলিশের অপরাধ অনুসন্ধানী বিভাগ (সিআইডি)-এর অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার ড. মো. রুহুল আমিন সরকার জানান, মোটরসাইকেল এখন কিশোর অপরাধ বা ‘কিশোর গ্যাং’-এর অংশ হয়ে উঠেছে। মাদক পরিবহন, দ্রুতগতিতে বাইক দৌড়ানো, ইভ-টিজিং এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে এসব বাহন ব্যবহার হচ্ছে। কিশোররা ট্রাফিক আইন, লাইসেন্স বা নিরাপদ চালনার প্রশিক্ষণ ছাড়াই মহাসড়ক ও শহরের রাস্তায় ঝুঁকি নিচ্ছে—এখানেই পরিবার ও সমাজের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কর্মব্যস্ত বা ভালোবাসায় ভরা অভিভাবকরা সন্তানের আবদার মেটাতে মোটরসাইকেল কিনে দিচ্ছেন। কিন্তু দক্ষ প্রশিক্ষণ, সঠিক গিয়ার বা আইনি প্রবেশদ্বারের অনুপস্থিতিতে এই উপহার অনেক সময় অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদের রাস্তা খুলে দেয়। তরুণ যখন শক্তিশালী যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করার জন্য অভিজ্ঞ নয়, তখন নিজে-পরের জন্য ঝুঁকি তৈরি হয়।
সমাধান হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন—কঠোর আইন প্রয়োগ, ল্যান্ডক্রসিং পর্যবেক্ষণ, অপর্যাপ্ত বয়সে লাইসেন্স প্রদানে নিষেধাজ্ঞার কার্যকর বাস্তবায়ন, হেলমেট ও সেফটি গিয়ার ব্যবহারের সচেতনতামূলক অভিযান এবং স্কুলে ট্রাফিক নিরাপত্তা বিষয়ক শিক্ষা জরুরি। একই সঙ্গে অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে—নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিন, অযৌক্তিক আবদার পূরণে ছেলেমেয়েকে ন্যূনতম বয়স ও প্রশিক্ষণ পোষণ না করে বাইক দেবেন না।
মোটরসাইকেল কেবল দ্রুত চলার একটি মাধ্যম নয়; সঠিক নিয়মনীতি ও দায়িত্বশীল ব্যবহার না থাকলে তা জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়। যদি আইন-শৃঙ্খলা, পরিবার, স্কুল ও সমাজ একযোগে কাজ করে, তবে এই নীরব মরণফাঁদকে অনেকটাই রোধ করা সম্ভব।






