অতিবৃষ্টি ও উজানের পাহাড়ি ঢলের কারণে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরাঞ্চলে বোরো ধানের ভয়াবহ ক্ষতি দেখা দিয়েছে। গত কয়েক দিনের অবিরাম বর্ষণ ও সীমান্ত নদী থেকে নেমে আসা প্রবল পানির তোড়ে সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ জেলায় প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর আধপাকা ও পাকা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। প্রাথমিক হিসাব অনুসারে দুই জেলায় আর্থিক ক্ষতি প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় ১ লাখ ১২ হাজারের বেশি কৃষক পরিবার এখন অনিশ্চয়তা ও দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছে।
ক্ষতির চিত্র সবথেকে ভয়াবহ সুনামগঞ্জে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন হাওরে প্রায় ১৬ হাজার হেক্টর জমির ধান সম্পূর্ণ নিমজ্জিত হয়েছে, যার বাজারমূল্য আনুমানিক ৩০০ কোটি টাকা। এই জেলায় ৮০ হাজারের বেশি কৃষক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। স্থানীয়রা বলছেন, ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে নানা অনিয়ম ও মানহীনতার ফলে বাঁধের কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ায় পাহাড়ি ঢলের চাপে তা টিকে থাকতে পারেনি।
শ্রমিক সংকট ও আবহাওয়ার খারাপ অবস্থার কারণে মাঠে ধান কাটার কাজও বাধাগ্রস্ত। কোমর সমান পানিতে হারভেস্টার মেশিন চালানো যায় না, ফলে হাতে-কলমে কাটার কাজ ধীরগতি হচ্ছে এবং পানিতে থাকা ধান দ্রুত পচে যাচ্ছে। অনেক কৃষক জানিয়েছেন, মৌসুম শেষের আগে ধান থেকে লাভ আদায় করা না পারলে ঋণ ও জীবনযাত্রার অনিশ্চয়তা আরো বাড়বে।
অপরদিকে কিশোরগঞ্জ জেলার হাওরাঞ্চলেও অবস্থা দ্রুত খারাপ হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নদ-নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে ইটনা ও অষ্টগ্রাম উপজেলার প্রায় ৯ হাজার ৪৫ হেক্টর জমি পানির নিচে চলে গেছে। এতে ৩২ হাজারের বেশি কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং আর্থিক ক্ষতি প্রায় ২০০ কোটি টাকা ধরেছে। কৃষকরা বলছেন, বারবার বজ্রপাত ও কালবৈশাখীর কারণে ক্ষেতেই কাজ করা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে, ফলে অনেক ক্ষেত্রের ধান কাটা সম্ভব হয়নি।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, ধনু ও মেঘনা নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে থাকলেও উজান থেকে প্রবাহিত অতিরিক্ত পানির ফলে নিম্নাঞ্চল দ্রুত প্লাবিত হচ্ছে। ব্যতিক্রমী বর্ষণ ও ভারতের কিছু অঞ্চলে অতিবৃষ্টির পূর্বাভাস থাকার কারণে এই পাহাড়ি ঢল আরও কয়েক দিন স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
প্রকৃতির এ রূপ রূপান্তরে এখন হাওরজুড়ে কৃষকেরা নিঃস্ব হওয়ার পথে দাঁড়িয়েছেন। বহু পরিবার বলছে, পচে থাকা সোনালি ফসল দেখে মন খারাপ হয়; একদিকে ঋণ, অন্যদিকে খাদ্য ও আয়ের অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে ভবিষ্যৎ অন্ধকারে পড়ে আছে। দীর্ঘক্ষণ ঠাণ্ডা পানিতে দাঁড়িয়ে কাজ করার ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে বলে তাঁরা জানায়।
জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট বিভাগ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তায় বিশেষ ত্রাণ এবং প্রণোদনা কর্মসূচি প্রকাশ করেছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুত করা শুরু হলেও মাঠের বাস্তব চিত্র বিবেচনায় এই সহায়তা কতটা যথেষ্ট হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, সবচেয়ে জরুরি হলো দ্রুত প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তের সঠিক চিহ্নায়ন এবং সময়োপযোগী আর্থিক ও খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দেওয়া।
এমন সময় কৃষি বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত ক্ষতিপূরণ, বীজ ও সয়াবিন/ডিজাস্টার রিলিফ কিট বিতরণ এবং পরবর্তী বর্ষা-উদ্দিষ্ট ক্ষতিগ্রস্ততার মোকাবেলার জন্য টেকসই বাঁধ ও জল ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন, এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সুদমুক্ত ঋণ, জরুরি কর্মসংস্থান ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের উদ্যোগও জরুরি। বর্তমানে হাওরাঞ্চল কেবল ফসল হারানোর বেদনায় ভুগছে না; সেখানে এখন মানবিক সহায়তার তাত্ক্ষণিক প্রয়োজন রয়েছে।






