নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার একাধিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য চুক্তিভিত্তিকভাবে সরবরাহ করা মিড-ডে মিল বা স্কুল ফিডিং-এর খাবার নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি হয়ে আসার অভিযোগ উঠেছে। প্যাকেটজাত রুটি, পচা ডিম ও কৃত্রিমভাবে পাকানো বলে সন্দেহভাজন কলা সরবরাহের ফলে শিশুরা পুষ্টির বদলে স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে—স্থানীয়রা এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে চুক্তি থাকা ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও) কিশোরগঞ্জ উপজেলার ১৭৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২১ হাজার ৩৩৪ জন শিক্ষার্থীর জন্য স্কুল ফিডিং প্রকল্পে রুটি, কলা, ডিম ও দুধ সরবরাহ করে। নীতিমালা অনুযায়ী সপ্তাহে ছয় দিন এসব খাদ্য দেওয়া হয়।
গত ২৮ এপ্রিল দুইটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়—চুক্তিবদ্ধ এনজিওর একজন কর্মী ছোট আকারের চিকন কলা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কলাগুলোর অনেক অংশ কালচে হয়ে যাওয়ায় স্থানীয়রা বলছেন এগুলো কৃত্রিমভাবে পাকানো বলে মনে হয়। কর্মী দাবি করেন, প্রতিটি কলার জন্য বরাদ্দ মাত্র ৫ টাকা, অথচ সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রতিটি কলার বরাদ্দ ১০ টাকা হওয়া উচিত।
২৯ এপ্রিল কয়েকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, অনেক দিনই পূর্ণভাবে খাবার পান না। রুটির প্যাকেট কেটে প্রতিযোগী হিসেবে মাপিয়ে একটি রুটি, দুধের প্যাকেট কেটে এক কাপ করে দুধ ও ডিম কেটে অর্ধেক করে দেয়া হয়—শিক্ষার্থীরাই এমন তথ্য দিয়েছেন। চাঁদখানার ছাত্রীরা আশা মনি ও রাজিয়া আক্তার বলেছেন, ‘রুটির প্যাকেটটি খেলে ভিতরের রুটি শক্ত ও টক ছিল, তাই আর খাওয়া হয়নি।’
মাগুড়া ইউনাইটেড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অনন্ত কুমার রায় স্বীকার করেছেন বরাদ্দ সংকট থাকায় প্রায়ই এক শিক্ষার্থীর বরাদ্দ অন্য এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে ভাগ করে দিতে হয়; তবে তিনি এ কাজের নিয়মীয়তা কিংবা বৈধতার বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেননি।
চাঁদখানা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আনিছুর রহমান ও রফিকুল ইসলাম জানান, শিক্ষার্থীদের অভিযোগে একটি প্যাকেট খুলে দেখা গিয়েছে রুটিগুলোই শক্ত ও টক হয়ে আছে, ফলে ছাত্রছাত্রীরা খেতে অনিচ্ছুক।
পুষনা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা জানিয়েছেন, নিয়মিতই নিম্নমানের খাবার দেওয়া হচ্ছে। কয়েকদিন আগে পচা ডিম বিতরণ হলেও বিষয়টি বিদ্যালয়ের প্রধানকে জানানো হয়; প্রধান শিক্ষক মোর্শেদা বেগমও পচা ডিম বিতরণের বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে বলেই জানিয়েছেন।
৩০ এপ্রিল বেকারিটি সরজমিনে দেখা গেছে—নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার নাউতারা ইউনিয়নের তৃপ্তি বেকারির সামনে মশা উড়ে বেড়াচ্ছে, গেট সংলগ্ন স্থানে প্যাকেটজাত রুটিগুলো অস্থির ও অস্বাস্থ্যকরভাবে ঘরের মতো স্থানে রাখা। শ্রমিকদের পোশাক ময়লা, মুখ-হাত ঠিকভাবে পরিষ্কার না করে কাজ চলছে এবং টয়লেটগুলোও নোংরা অবস্থা।
বেকারির মালিক রফিকুল ইসলাম বলেছেন, তার কাগজপত্র সঠিক আছে কিন্তু তিনি দাবি করেছেন যে ইএসডিও তার সঙ্গেই চুক্তি করেনি; যদিও প্যাকেটে বেকারির নাম থাকার প্রমাণ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘আমার কাছ থেকে ১০ হাজার প্যাকেট নেওয়া হয়েছে, বাকিটা কে দিয়েছে আমি জানি না’ এবং বিষয়টি নিয়ে লেখালেখি করলে জটিলতা তৈরি হবে বলে অনুরোধ করেন।
ইএসডিওর জেলা ম্যানেজার মো. সামছুল আলম বলেন, তাদের সঙ্গে তৃপ্তি বেকারিরই চুক্তি আছে। নোংরা পরিবেশে তৈরি খাবার বিতরণের সম্পর্কিত প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সমস্যাগুলো প্রকাশ পেলে আগে আমরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবো—সংশোধনের সুযোগ দিলে তারা ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মাহমুদা খাতুন ঢাকায় ট্রেনিংয়ে থাকায় সরাসরি মন্তব্য পাননি স্রোতরা। উপজেলা নির্বাহী অফিসার আরিফুর রহমান বলেছেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে পচা ডিমসহ অনিয়মের খবর দেখে তিনি বিষয়টি অবগত হয়েছেন এবং সরেজমিন তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবেন।
স্থানীয় শিক্ষক, অভিভাবক ও প্রশাসনিক সূত্র মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে—শিশুদের জন্য বরাদ্দকৃত খাবারের মান ও সরবরাহ প্রক্রিয়া দ্রুত যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযুক্ত বেকারি, চুক্তিবদ্ধ সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রশান্ত ব্যাখ্যা ও দ্রুত তদন্ত ছাড়া শিশুর স্বাস্থ্যের ঝুঁকি দমন করা যাবে না। স্থানীয় মাতামহদের অনুরোধ, ‘দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক এবং ভবিষ্যতে শিশুদের জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা হোক।’






