বরগুনা জেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের ৩৬ কোটি টাকার টেন্ডার পরিচালনায় অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠে এসেছে। অভিযোগকারী স্থানীয় প্রভাবশালী ও বিএনপির প্রয়াত মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের এপিএস তালতলীর বাসিন্দা ওমর আব্দুল্লাহ শাহীন।
ওমর আব্দুল্লাহ শাহীনের অভিযোগে বলা হয়, নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসান খান, সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী শ্যামল কুমার গাইন ও সহকারী প্রকৌশলী রাজিব শাহ মিলিয়ে টেন্ডার প্রক্রিয়াে ভাবনা-ভাবনা করে পাঁচটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ৩৬ কোটি টাকার কাজ পৌঁছে দিয়েছেন। অভিযোগ অনুযায়ী এসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিকরা মূলত আওয়ামী লীগের লোকজন বা অভিযুক্ত প্রকৌশলী তিনজনের নিকটাত্মীয়।
প্রকল্প ও প্রক্রিয়া
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত মার্চে আমতলী-তালতলীর গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়; এতে ৭৭টি প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করে। এরপর ২০ এপ্রিল পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, যা অনিয়ম ও অনৈতিকতার আশ্রয়ে হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ওমর আব্দুল্লাহ। তিনি আরও দাবি করেছেন, জলবায়ু প্রকল্পের খাল খননের মতো কাজে অনিয়ম থাকলেও নির্বাহী প্রকৌশলী নির্দেশ না দিয়ে বরং প্রকল্পের অর্থ ছাড় করে দিয়েছেন।
টেন্ডার গ্রহনকারী প্রতিষ্ঠানের সংযোগ
অভিযুক্ত তিন প্রকৌশলীর নিকটাত্মীয় ও রাজনৈতিকভাবে সংযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে গণ্যমান্য নামগুলো হলো:
– বরিশালের এমএস লুৎফুল কবির ট্রেডার্স (নির্বাহী প্রকৌশলীর নিকটাত্মীয়)
– এমএস নুর কনস্ট্রাকশন (শেখ সেলিমের ভাগনে, গোপালগঞ্জ জেলা যুবআলীগ নেতা শেখ আতিকুর রহমান নুরের)
– লেলিন-দিপ (জয়েন্ট ভেঞ্চার) ও এসএম লেলিন ট্রেডার্স (সহকারী প্রকৌশলী রাজিব শাহের নিকটাত্মীয়)
– নিশিত বসু ট্রেডার্স (সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী শ্যামল গাইনের নিকটাত্মীয়)
মসজিদ-মন্দির সংস্কার ও আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ
ওমর আব্দুল্লাহ আরও অভিযোগ করেছেন যে স্থানীয় মসজিদ ও মন্দির সংস্কারের কাজেও ঠিকাদারদের কাছ থেকে ২৫ শতাংশ অনেকে ছেড়ে নেওয়া হয়; ফলে ঠিকাদাররা দায়িত্বহীন কাজ করে বরাদ্দকৃত অর্থ ছাড় পেয়ে যান। স্থানীয়রা জানান, বরগুনা জেলা থেকে মসজিদ সংস্কারের জন্য যে অর্থ বরাদ্দ হয়েছিল, ঠিকাদাররা তার অর্ধেক কাজই করেন এবং বাকি অর্থও ছাড়পত্র পেয়ে যান।
স্থানীয়দের মন্তব্য
গুলিশাখালীর আব্দুল মান্নান বলেন, ‘‘মসজিদ সংস্কারের জন্য বরাদ্দ ৩ লাখ টাকা; ঠিকাদার মাত্র ১ লাখ ৫০ হাজার টাকার কাজ করেছেন। বিষয়টি নির্বাহী প্রকৌশলীকে জানিয়েছি, তবু কোন ব্যবস্থা হয়নি।’’ খুরিয়ার খেয়াঘাটের ইমাম মো. রফিকুল ইসলাম ও কড়াইবাড়িয়া ইউনিয়নের সাধারণ সদস্য রেদওয়ান সরদারও একই ধরনের অভিযোগ করেন।
অফিশিয়াল পদক্ষেপ
বরিশাল বিভাগীয় অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও তদন্ত কর্মকর্তা শেখ মোঃ নুরুল ইসলাম (এলজিইডি) অভিযোগের প্রাথমিক তদন্তের নির্দেশ পেয়েছেন। প্রধান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন তাকে মামলা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। তদন্ত শুরু হওয়ার দিন নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ১৪ মে; তদন্ত কাজটি বরগুনা এলজিইডি রেস্ট হাউসে করা হবে এবং অভিযোগকারীকেও নোটিশ দেয়া হয়েছে বলে জানান তদন্তকারী কর্মকর্তা।
অভিযুক্তদের প্রতিক্রিয়া
অভিযোগের বিষয়ে নাম্বার দেয়া হলে বরগুনা নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসান খান বলেন, ‘‘যে কারণে অভিযোগ করা হয়েছে, তা অভিযোগকারী ব্যক্তিই বলতে পারবেন। আমি টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম করিনি।’’ অন্যদিকে তদন্ত কর্মকর্তা শেখ মোঃ নুরুল ইসলাম ফোনে নিশ্চিত করেন যে নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং ১৪ মে তদন্ত কার্যক্রম শুরু হবে।
পরবর্তী করণীয়
তদন্ত শুরু হলে তথ্য-প্রমাণ ও সাক্ষ্য অনুযায়ী কারও বিরুদ্ধে শাস্তিমুলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, তা চূড়ান্ত হবে। স্থানীয় জনগণ বলেন, স্বচ্ছতা না থাকলে প্রকল্পের অর্থ অনর্থকভাবে ব্যয় হবে এবং সাধারণ মানুষই ভোগাভোগী হবে। অভিযোগ ও কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে দ্রুত ও স্পষ্ট তদন্ত দাবি করছেন নানা স্তরের নেতারা ও স্থানীয়রা।






