মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন এক তথ্যচাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুসারে, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) গত এপ্রিলে ইরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধনাগারে গোপন হামলা চালায়। তথ্যটি প্রকাশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওই অঞ্চলে আমেরিকা ও ইসরায়েলের জোটে ইউএই’র অংশগ্রহণকে নিয়ে প্রশ্ন اٹھেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এপ্রিলের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিচ্ছিলেন, ঠিক সেই সময় আবুধাবি ইরানের লাভান (Lavan) দ্বীপে অবস্থিত একটি তেল শোধনাগার লক্ষ্য করে হামলা চালায়। লাভান দ্বীপে থাকা ওই শোধনাগার ইরানের অন্যতম বড় কারখানা; সেখানে দৈনিক প্রায় ৬০ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত হয়।
ওয়াশিংটন reportedly এই ঘটনার বিষয়ে আগেই অবহিত ছিল এবং আংশিকভাবে এতে ‘‘স্বাগত’’ জানিয়েছে—তবে আমিরাত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে হামলার কথা স্বীকার করেনি। আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সীমিত বক্তব্যে কেবল বলেছে, কোনো শত্রুভাবাপন্ন কর্মকাণ্ডের বিপরীতে তাদের প্রতিরক্ষা করার অধিকার আছে।
বার্তায় বলা হয়, আবুধাবি সম্ভবত তাদের উন্নত বিমানবাহিনী—যাতে ফরাসি মিরাজ ও আধুনিক এফ-১৬ শরিক আছে—ব্যবহার করে ওই অপারেশন চালায়। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পূর্বের সময়ে ইরানের আঘাতে আমিরাতের ভ্রমণ ও আবাসন খাত যে ক্ষতির মুখে পড়েছিল, তার প্রতিশোধের অংশ হিসেবে এই কর্মকাণ্ডকে দেখা হচ্ছে।
ইরানের রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম আইআরআইবি হামলাটিকে ‘‘কাপুরুষোচিত’’ আখ্যা দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ইরান প্রতিশোধ হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতে ড্রোন‑ও মিসাইল হামলা চালায়। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, এই ধরনের গোপন অপারেশন ও প্রতিশোধমূলক আঘাত মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে দেবে।
ইরানের নীতি নির্ধারণী গণ্যমান্য এবং ইরানের বিপ্লবী গার্ড (আইআরজিসি)‑এর সাবেক কমান্ডার মোহসেন রেজায়ি মুসলিম ও আরব দেশগুলোকে সতর্ক করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বার্তায় তিনি বলেন, ইসরায়েল বা ‘‘জায়নবাদী শাসকগোষ্ঠী’’ এই অঞ্চলে সংঘাত ছড়িয়ে অঞ্চলের সম্পদ ও ভূখণ্ড দখলের ষড়যন্ত্র করছে। রেজায়ি সরাসরি আঞ্চলিক দেশগুলোকে বলেছেন—সতর্ক ও বিচক্ষণ থাকতে হবে এবং এমন কোনো সহযোগিতা করা উচিত নয় যা তাদের জন্য বিধ্বংসী পরিণতি ডেকে আনবে।
একই সময়, চলমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ব্যয়ের পরিসংখ্যানও উল্কিপাতে পরিণত হচ্ছে। ‘ইরান ওয়ার কস্ট ট্র্যাকার’ পোর্টালের সাম্প্রতিক রিয়েল‑টাইম হিসাব বলছে, অভিযানের ৭১তম দিনে মার্কিন সামরিক ব্যয় ৭৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৭ হাজার ৭০০ কোটি) অতিক্রম করেছে। পোর্টালটি পেন্টাগনের কংগ্রেসে দেওয়া তথ্য ও মোতায়েনকৃত সামরিক সম্পদ বিবেচনায় এই হিসাব করেছে; তাদের হিসাব অনুযায়ী অভিযানের প্রথম ছয় দিনে খরচ হয়েছিল ১১.৩ বিলিয়ন ডলার এবং পরবর্তী প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে।
অন্য দিকে, ইরানও পরিস্থিতি মোকাবিলায় কড়া রাস্তায় অবস্থান প্রদর্শন করছে। ইরানের সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক মাধ্যম এক্স‑ে লিখেছেন, তেহরান যে কোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ‘‘স্মরণীয় ও দাঁতভাঙা’’ জবাব দিতে প্রস্তুত। তিনি আরও জানিয়েছেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী সব ধরনের পরিস্থিতির জন্য বিকল্প ব্যবস্থা রেখেছে এবং তাদের শত্রুরা আকস্মিকভাবে হতবাক হবে।
ওভারঅল হিসেবে, ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সেই রিপোর্টে যদি উল্লেখিত ঘটনা সত্যি হয়, তাহলে তা শুধু দু’দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ সংঘাত নয়—এটি মধ্যপ্রাচ্যে জোট, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও শক্তি সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলবে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, গোপন অপারেশন ও প্রতিশোধের চক্র যত বাড়বে, অঞ্চলের নাগরিক ও অবকাঠামোর ওপর মানসিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব তত বেড়ে যাবে।






