আসন্ন ঈদুল আজহার অপেক্ষায় মেহেরপুরের শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী বামন্দী পশুহাট কয়েক সপ্তাহ ধরে উত্সবমুখর রূপ নিয়েছে। হাটে বিপুল সংখ্যক দেশি গরু উঠায় ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপস্থিতিও চোখে পড়ছে এবং বেচাকেনার চাঞ্চল্য সীমাহীন।
পাঁচ থেকে সাত জেলার পাইকারি ক্রেতা-ব্যবসায়ী প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পশু কেনাবেচায় সরব থাকছেন। ঢাকাসহ দেশের নানা স্থানের ব্যবসায়ীরা নিয়মিত এখানে এসে গরু ও ছাগল কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। কয়েক বছরের তুলনায় এবারের পশুর সরবরাহ বেশি থাকলেও মূল্য নিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বামন্দী-নিশিপুর পশুহাট সপ্তাহে দু’দিন (শুক্রবার ও সোমবার) বসে। বছর হিসেবে কিছু মাসে মোট ৯টি হাট বসে বলে স্থানীয়রা জানাচ্ছেন। হাট দুটিতে প্রতিদিন হাজারের ওপর গরু-ছাগল উঠছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, এখনও কোরবানির এক থেকে দুই সপ্তাহ আগে হওয়ায় সরবরাহ ও চাহিদার সমন্বয় নিয়ে কিছু অনিশ্চয়তা থাকলেও চলতি মাসে হাট থেকে সাড়ে ৪শ কোটি টাকার পশু কেনাবেচা হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। হাট ইজারাদারা বিক্রির এই পরিমাণকে ৪০০ থেকে ৪২০ কোটি টাকার সম্ভাব্য হিসাব হিসেবে দেখাচ্ছেন।
হাট সংক্রান্ত সরকারি ও স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, মেহেরপুর জেলায় কোরবানির জন্য মোট প্রায় ১ লাখ ৭২ হাজার ৫৬৯টি পশু প্রস্তুত রয়েছে। এর মধ্যে ষাঁড় (বালু/বছর?) রয়েছে ৪০,৩৪৯টি, বলদ ৪,৮৪৪টি, গাভি ৮,৫০৯টি, মহিষ ৪৮২টি, ছাগল ১,১৫,৬৬৫টি এবং ভেড়া ২,৭২০টি। জেলায় কোরবানির চাহিদা লোকাল পর্যায়ে প্রায় ৭-৯০ হাজারের মত; কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে স্থানীয় চাহিদা ৯০,২৩৪টি পশু।
অন্যদিকে জেলা পর্যায়ের খামারি সংখ্যে কিছু তথ্যগত ভিন্নতা দেখা যায়: একদিকে বলা হচ্ছে জেলায় ছোট-বড় প্রায় এক হাজার খামারি রয়েছেন, অন্যদিকে উল্লেখ করা হয়েছে ১৭ হাজার খামারে দেশীয় ও স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতিতে মোটাতাজা করা হয়েছে ৬ লাখ ১৭ হাজার ৭২৩টি গবাদিপশু — যাদের সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা। এসব সংখ্যার প্রেক্ষিতে স্থানীয়রা আশা করছেন বড় আকারের বাণিজ্য হবে।
কুমিল্লা থেকে আসা গরুব্যবসায়ী আকবর আলী বলেন, বামন্দী বাজারে সরবরাহ ভালো এবং মেহেরপুরের গরুগুলো দেহ গঠনে সুন্দর হওয়ায় বাইরের বাজারেও এর চাহিদা বেশি। তাই প্রতি বছরই তিনি মেহেরপুরের গরু কিনে দেশের বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করেন। তবে এ বছর গরুর দাম একটু বেশি হওয়ায় তার বেচাকেনার লক্ষ্যমাত্রা পুরোপুরি পূর্ণ নাও হতে পারে বলে জানান তিনি।
স্থানিক খামারি মোশারফ আলী জানান, খড়-ভুষি ও চারণ খরচ বেড়ে গরু লালন-পালনে ব্যয় বাড়ায় আয়ের অংশ কেটে যাচ্ছে। তাই ব্যবসায়ীরা অনেকেই কষ্টে বিক্রি করছেন। তিনি বলেন, ‘‘আমি আমার টার্গেট অনুযায়ী দাম না পেলে গরু বিক্রি করছি না। ঢাকার পার্টি আসলে দাম ঠিক পাওয়া যায়।’’ তিনি স্থানীয় দালাল ও সিন্ডিকেটিংয়ের অভিযোগও তুলেছেন, যার ফলে খামারীরা ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না।
হাট ইজারাদার হারুন অর রশিদ (বাচ্চু) বলেন, চলতি হাটে জাল টাকার ব্যবহার রোধে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং পুলিশ টহল সার্বক্ষণিক রয়েছে। তিনি জানান, খাজনা হিসেবে প্রতি পশু হিসেব করে ৬০০-৭০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে যাতে ক্রেতা-বিক্রেতা দু’পক্ষই সুবিধা পান। বাচ্চু আরো বললেন, ‘‘এই শুক্রবারের হাটে ৪৫০০ থেকে ৫০০০ পিস গরু বিক্রি হবে; ছাগলের সংখ্যা প্রায় ৩৫০০ পিস। এগুলো মিলিয়ে চলতি মাসে হাট থেকে ৪০০ থেকে সাড়ে ৪০০ কোটি টাকার ব্যবসা হওয়ার আশা করছি।’’
অন্য হাট ইজারাদার রাশিদুল ইসলাম (সোহাগ) বামন্দী পশুহাটকে মেহেরপুর জেলার ‘হৃদপিণ্ড’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এই হাটের উপর অনেক মানুষের রুটিন আর জীবিকা নির্ভর করে। আশপাশের কয়েকটি জেলা থেকে খামারি ও ব্যবসায়ীরা এখানে এসে অংশগ্রহণ করেন। তিনি বলেন, ‘‘আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে এখানে গড়ে প্রতিবারে প্রায় ৫ হাজার গরু-ছাগল বিক্রি হয়; মাস ভিত্তিতে এ হাট থেকে আনুমানিক সাড়ে চারশ কোটি টাকার ব্যবসা হতে পারে।’’
গাংনী থানার ওসি উত্তম কুমার দাস জানিয়েছেন, জেলা পুলিশের নির্দেশনায় হাটটির সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পুলিশের একাধিক টিম হাটের দিনে নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করছে, যাতে আইনশৃঙ্খলা বজায় থাকে এবং জাল নোট বা চুরি-ছিনতাই প্রতিরোধ করা যায়।
হাটের সরবতা ও ব্যবসায়ীদের তৎপরতা থেকে স্পষ্ট যে, কোরবানির মৌসুমে মেহেরপুরের বামন্দী পশুহাট জেলা ও আশপাশের এলাকার অর্থনৈতিক গতিশীলতার বড় উৎস হিসেবে কাজ করবে। তবে মূল্যস্থিতি, পরিবহন খরচ ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কার্যকলাপ কিভাবে চূড়ান্ত বিক্রির পরিমাণকে প্রভাবিত করবে, সেটাই এখন দেখবার বিষয়।






